প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
বজ্রপাত। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বে প্রতিবছর বজ্রপাতে ৬ থেকে ২৪ হাজার মানুষের প্রাণ যায়। বাংলাদেশে বছরে ২৫০ থেকে সাড়ে তিনশ মানুষের মৃত্যু হয়। এসব মৃত্যু প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা।
তারা বলেন, লাইটিং এরোস্টোরের মতো যন্ত্র বসিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যু কমানো যাচ্ছে না। তাই মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর পরিমাণ কমাতে হবে।
রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে রবিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস পালন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’ স্লোগানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, রিজিওনাল ইনটিগ্রেটেড মাল্টি-হেজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) এবং ইউনিসেফ, ব্র্যাক, সেভ দ্য চিলড্রেন, জার্মান হিউম্যানেটিরিয়ান এসিস্ট্যান্টের উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়।
বক্তারা বলেন, উন্নত পূর্বাভাস প্রযুক্তির পাশাপাশি সঠিক সময়ে মানুষের কাছে নির্ভুল তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং সে অনুযায়ী আচরণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে সহযোগী সংস্থাগুলোর চলমান ও ভবিষ্যৎ উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। সেখানে সেভ দ্য চিলড্রেনের ম্যানেজার জাভেদ মিয়াঁদাদ জিএফএফও-সমর্থিত প্রকল্পের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। রাইমসের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. ফকরুল আরেফিন রাইমস–ইউনিসেফ সহযোগিতার বিভিন্ন কার্যক্রম উপস্থাপন করেন। এছাড়া এফসিডিওর ক্লাইমেট অ্যান্ড লাইভলিহুডস অ্যাডভাইজার এবং ডেপুটি টিম লিডার এ বি এম ফিরোজ আহমেদ ইউকে-বডিহাইড্রমেট কোলাবোরেশনের উদ্যোগ তুলে ধরেন।
‘মাঠ থেকে কণ্ঠস্বর’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সুনামগঞ্জের মো. এমদাদ হোসেন, আরেফিন, ফোরকান উদ্দিন, সন্ধ্যা রানী দাস ও সাগরিকা। তারা কেউ বজ্রপাতে স্বজন হারিয়েছেন, আবার কেউ সরাসরি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রাশাদুজ্জামানের সঞ্চালনায় তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, বজ্রপাত মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
আলোচনায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে বিদ্যালয়ের ছুটি সমন্বয়, নৌযানে লাইফ জ্যাকেট রাখা, বজ্রপাতের সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া এবং কৃষকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগাম বার্তা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
কারিগরি অধিবেশনে আবহাওয়াবিদ এস. এম. কামরুল হাসান জানান, রাইমসের কারিগরি সহায়তায় ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘বজ্রপাত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা’ চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে ১ থেকে ৬ ঘণ্টা আগেই বিএমডির ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার আগেই পূর্বাভাস ছিল, কিন্তু সেই তথ্য মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায়নি বা ব্যবহার হয়নি। এ প্রযুক্তিকে স্থায়ী ও তৃণমূলমুখী করতে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সচেতনতাই জীবন রক্ষার প্রধান উপায়।
আবহাওয়াবিদ এস এম কামরুল হাসান বলেন, প্রতিটি দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতন করতে প্রত্যেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। আর বজ্রপাত সম্পর্কে তথ্য দেওয়াটা কঠিন। আমরা শূন্য থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে এ তথ্য দেওয়া যায়। তবে ৬ ঘণ্টা আগেও দেওয়া সম্ভব। এজন্য গতবছর থেকে রাইমসের সহায়তায় আর্লি ওয়ার্নিং বা পূর্ব সতর্কতা জারি করা হচ্ছে। তিনি হাওরাঞ্চলে বিজ্ঞানসম্মত ছাউনি তৈরির আহ্বান জানান।
রাইমসের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ খান মোহাম্মদ গোলাম রব্বানি বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেন, মেঘের বৈদ্যুতিক চার্জ ও ভূমির ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহের সংযোগে বজ্রপাত ঘটে, যা বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন স্থিতিকরণেও ভূমিকা রাখে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে এবং এতে প্রায় ৩৫০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এবং এপ্রিল–মে মাসে ঝুঁকি বেশি থাকে।
একই সঙ্গে খোলা মাঠে দলবদ্ধ হয়ে অবস্থান না করা, বড় গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
সিলেটের সন্ধ্যা রানী বলেন, বজ্রপাত উপেক্ষা করে মাঠ থেকে গরু-ছাগল নিয়ে আসি। আমাদের গরু-ছাগলকে মাঠে ঘাস খাওয়াতে বেধে রাখা হয়। তখন নিজের জানের চেয়ে মালের (গরু-ছাগল) মায়া বেশি লাগে। এ সময় নিজের চিন্তা না করে গরু, বাছুর, ছাগল আনতে মাঠে চলে যাই।
সন্ধ্যা রানীর মতো একাধিক ব্যক্তি একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেন।
সভায় বক্তারা বলেন, দেশে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে। বছরে এতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় গড়ে ২৫০-৩০০ জনে। এতে বজ্রপাতজনিত ঝুঁকি হ্রাস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আগাম সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে প্রচারে গুরুত্বারোপ করা হয়।
ডিএইর জামাল উদ্দিন বলেন, পহেলা এপ্রিল থেকে ৯ মে পর্যন্ত ১১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। কৃষকরা মাঠে ধান কাটতে গিয়ে বা কাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ যাচ্ছে। আমরা এক্ষেত্রে আরো সচেতনতা বাড়িয়ে বজ্রপাত থেকে মৃত্যু কমাতে পারবো।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের খামার বিভাগের পরিচালক মো. শরিফুল হক বলেন, চলতি বছর এ যাবত বজ্রপাতে ৪৪টি গবাদি পশু মারা গেছে।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব মো. সাঈদুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভূমিকম্প ও বজ্রপাতে মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বারোপ করেছেন। ইতোমধ্যে বজ্রপাতে করণীয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বৈঠক করা হয়েছে। আগামীতে আরো আলোচনা করে ব্যবস্থা নিতে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, হাওরসহ সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে আমাদের অবকাঠামো তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। সেখানে লাইটিং এরেস্টোর স্থাপন করার চেয়ে সচেতনতা বেশি সহযোগিতা করবে।