জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে রবিবার সকাল ১১টায় নিমতলী দিবস উপলক্ষ্যে এক সেমিনারের আয়োজন করে বাপা। ছবি: বাপার ফেসবুক পেজ থেকে
নিমতলী দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা দাবি করেছেন, নিমতলী ট্রাজেডি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
তারা বলেছেন, এসব দুর্ঘটনা দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা ঘাটতির ফল।
ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত নগর পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
“নিমতলী ট্র্যাজেডি: অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড থামবে কবে?” শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।
জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে রবিবার সকাল ১১টায় এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জমান মজুমদার। স্বাগত বক্তব্য দেন বাপার যুগ্ম সম্পাদক জাভেদ জাহান।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক পরিচালক মেজর শাকিল নেওয়াজ, বাপার নির্বাহী সদস্য স্থপতি ইকবাল হাবিব, বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজী মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম এবং বাপার নির্বাহী সদস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা।
এ ছাড়া বাপার সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান, যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিম দাদ খান, হুমায়ুন কবির সুমন, নির্বাহী সদস্য হাজী শেখ আনসার আলী, শাকিল কবির, ফাহমিদা নাজনিনসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আব্দুস সালাম বলেন, আর্থিক লাভের আশায় অনেকেই আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল গুদামের জন্য ভবন ভাড়া দিয়ে থাকেন, যার ফলে নিমতলী ও চুড়িহাট্টার মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন সাধারণ মানুষ।
এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিল্ডিং কোডের কঠোর বাস্তবায়নের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আব্দুস সালাম বলেন, সমাজের শিক্ষিত ও বিত্তবান শ্রেণির মধ্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের সামগ্রিক পরিবর্তন সম্ভব।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, কেমিক্যাল ব্যবসা নদীকেন্দ্রিকভাবে গড়ে ওঠায় বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দূষণ আশঙ্কাজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। কার্যকর নীতিমালার অভাবে পরিবেশসংক্রান্ত বিদ্যমান আইনও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
তিনি ঢাকাকে রক্ষায় সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় ও জনগণের সক্রিয় সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেন।
বিশেষ অতিথি মো. ছালেহ উদ্দিন বলেন, দেশের যেকোনো দুর্যোগে ফায়ার সার্ভিস সবার আগে কাজ শুরু করে। কিন্তু ভবন নির্মাণে নিয়ম না মানা, অনুমোদনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, পুরান ঢাকার অনেক স্থানে খাটের নিচেও রাসায়নিক পদার্থ মজুত রাখার ঘটনা দেখা যায়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
মূল প্রবন্ধে ড. আহমেদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নগর পরিকল্পনা গড়ে না ওঠায় বাংলাদেশ বারবার ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে।
তিনি নিমতলী ট্র্যাজেডিকে দেশের রাসায়নিক নিরাপত্তা ও নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে মূল্যায়নের আহ্বান জানান।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
পরিবেশ ও জনবান্ধব উন্নয়নের স্বার্থে ঢাকার সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ এবং সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান তিনি।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, নিমতলী ট্র্যাজেডির পর বাপা পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে বড় আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, যদি ঢাকার ৯৪ শতাংশ ভবন অবৈধ হয়, তাহলে রাজউক কী করছে।
নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, রাসায়নিক ব্যবসার অনুমোদন ও সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততাও জরুরি।
গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, শুধু কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে নেওয়াই সমাধান নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তিনি ফায়ার সার্ভিসকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার প্রস্তাব দেন এবং বলেন, যেসব দেশে এ ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে অগ্নি নিরাপত্তা তুলনামূলক উন্নত।
হাজী মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে মিটফোর্ড এলাকায় ৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পণ্যের মজুত আর নেই।
সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও সুস্পষ্ট নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
সেমিনার থেকে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১১ দফা সুপারিশ উত্থাপন করা হয়।
সুপারিশগুলো হলো: আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা অপসারণ, জাতীয় রাসায়নিক নিরাপত্তা কাঠামো প্রণয়ন, ফায়ার সার্ভিসের আধুনিকায়ন, আইন ও বিল্ডিং কোডের কঠোর বাস্তবায়ন, ডিজিটাল লাইসেন্সিং ও নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের জাতীয় ডেটাবেস তৈরি, বাধ্যতামূলক ফিটনেস সার্টিফিকেট চালু, জরুরি প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ নগরায়ণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং জাতীয় নগর অগ্নি ও রাসায়নিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন।