কর্মশালায় বক্তারা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের বার্ষিক গবেষণা পর্যালোচনা কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে তুলা চাষের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও জনবল ও প্রকল্প সংকটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। দেশে বর্তমানে চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ তুলা উৎপাদন হয়, বাকি ৯৭ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি বিতরণ, অর্থায়ন এবং চরাঞ্চলে তুলা চাষ করতে পারলে দেশের চাহিদা পূরণ করে রপ্তানি করা যাবে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের বার্ষিক গবেষণা পর্যালোচনা কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকার ফার্মগেটে নিজস্ব ভবনে শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিনের সভাপতিত্বে কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন চেয়ারম্যান (সচিব পদমর্যাদা), বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কৃষিবিদ মো. হাসান জাফির তুহিন, বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউটের প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. জহির উদ্দিন, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ডেপুটি ডিরেক্টর কুতুব উদ্দিন।
মো. হাসান জাফির তুহিন বলেন, দীর্ঘদিন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক কাজ করা সত্ত্বেও বিগত সরকারের ভালো কাজগুলো নিয়েও মানুষ কথা বলছে না। কেননা তাদের প্রতি মানুষের সমর্থন ছিল না।
তুহিন বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তুলা আমদানিকারক দেশ। এটা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। আমাদের আবহাওয়া তুলা চাষের উপযোগী। চীন থেকে তুলা আমদানি করি। ৩০ শতাংশ তুলা উৎপাদন করার পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের সামনে এগোতে হবে।
ড. শহিদুল ইসলাম বলেন, রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটিতে অম্ল সৃষ্টি হয়েছে। বরেন্দ্র ভূমিতে প্রচুর ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। আমাদের দ্বিতীয় বিপ্লব শুরু হোক বরেন্দ্র থেকে। ১২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিলে ৬০ হাজার কোটি টাকা আয় করা যাবে। খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিতে বরেন্দ্রে অবশ্যই নেতৃত্ব দিতে হবে। তিনি শূন্যপদগুলো পূরণে সরকারের কাছে আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সাইফুল্লাহ বলেন, জিডিপিতে কটনের স্থান ৩০ শতাংশ। বর্তমানে তুলা ২-৩ শতাংশ উৎপাদন হয় এবং ৯৭ শতাংশ তুলা আমদানি করতে হয়। এজন্য তুলা নিয়ে একটি নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. একে এম আমিনুল ইসলাম বলেন, তুলা বহু গুণে গুনান্নিত। তিনি প্রকল্প বৃদ্ধির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তুলাচাষে প্রায় ৬-৮ মাস লাগে, এটি গবেষণা করে সময় কমাতে হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. ইবরাহিম খলিল বলেন, তুলা কৃষক, ডিলার ও ক্রেতা- তিন ধরনের লোককে সহযোগিতা করে থাকে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. জহির উদ্দিন বলেন, লবণাক্ত জমিতে তুলাচাষের সম্ভাবনা যাচাই করা দরকার।
মো. রেজাউল আমিন বলেন, সরকার গত তিন বছর যাবত তুলা চাষে ১০, ১৭ ও ২০ কোটি টাকা প্রণোদনা সহায়তা দিয়েছে। এতে কৃষকদের প্রণোদনার পরিমাণ বাড়বে।
কুতুব উদ্দিন জানান, দেশের ৫৭টি জেলায় তুলাচাষ হচ্ছে। আগে পাহাড়ের তুলা জাপানে রপ্তানি হতো। এখন সেখানে চাষাবাদ কমে গেছে। বীজ উৎপাদন, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, বছরে ৬.৫৯ বেল তুলা উৎপাদন হয়। ২০৩০ সালে ০.৭ লাখ হেক্টর জমিতে চাষাবাদে ৫ লাখ বেল ৫ লাখ টন উৎপাদন হবে। ৬০ শতাংশ নারী তুলা চাষে যুক্ত। তুলাকে বলা হয় দারিদ্রবিমোচন ফসল। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তুলা চাষ হয়। বর্তমানে দেশে চাহিদার ২০ শতাংশ তুলা উৎপাদন হয়।
কার্বন ক্রেডিট বিক্রি হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, তুলাচাষে কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করা হবে। এতে প্রতি হেক্টরে কৃষককে ২০০ ডলার দেওয়া হবে। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গকে তুলার হাব হিসেবে তৈরি করা হবে। তা ছাড়া ভারত কম মূল্যে তুলা ডাম্পিং করার ফলে কৃষকরা দাম পায় না বলে জানান তিনি।
আফ্রিকা মহাদেশে তুলা চাষে যাওয়ার জন্য খালেদা জিয়া উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। দেশে বছরে ৯০ হাজার কোটি টাকার তুলা দরকার হয়। আফ্রিকায় তুলাচাষ করতে পারলে ৩০ হাজার কোটি টাকা বাঁচবে।
টাঙ্গাইলের তুলাচাষি মো. আলিয়ার হোসেন আষাঢ় (জুলাই) মাসে তুলার বীজ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি গত বছর ৩ বিঘায় ৪৫ মণ তুলাচাষ উৎপাদন করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি বিঘায় ১২০০ টাকা ব্যয় হয়। তিনি তিন বিঘায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার তুলা বিক্রি করেন।
ময়মনসিংহের চাষি মতিউল ইসলাম জানান, তিন বিঘায় ৬৮ হাজার টাকা ব্যয় করে তুলা চাষ করে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বিক্রি করেছেন।
কর্মশালায় জানানো হয়, আগে বিঘায় ৬-৭ মণ তুলা উৎপাদন হতো, বর্তমানে ১৫-২৫ মণ পর্যন্ত ফলন হচ্ছে বলে জানানো হয়। তুলার সঙ্গে মুলা, পাট শাক, হলুদ, মরিচ, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন সাথী ফসল চাষ করে লাভবান হচ্ছে কৃষক। তা ছাড়া পাহাড়িদের তুলা চাষের জন্য আর্থিক সহযোগিতা দরকার বলে জানানো হয়।
আরমাডা স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ডিরেক্টর (অপারেশনস) আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ তুলা বাংলাদেশের। ৩ লাখ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করলে টেক্সটাইল সেক্টরে আমদানি কমে যাবে। ২০২৫ সালে বিশ্বে টেক্সটাইলের বাজার ছিল ২ হাজার বিলিয়ন ডলার, ২০৩০ সালে তা দাঁড়াবে ৩ হাজার বিলিয়ন ডলার। আমরা মাত্র ২ শতাংশ বাজার ধরতে পেরেছি।