সীমান্ত সম্মেলন
ভারতের নয়াদিল্লিতে চারদিন ধরে বিজিবি ও বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছবি: বিএসএফের ফেসবুক পেজ থেকে
ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন সম্পন্ন হয়েছে।
সম্মেলনটি ৮ জুন থেকে ১১ জুন পর্যন্ত চারদিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, মানবিক ইস্যু ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আলোচনায় সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন ঘটনা এবং ভুয়া তথ্য ও গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিষয়সহ বেশ কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
সীমান্তে হত্যা ও সহিংসতা দেখতে চায় না বিজিবি
সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় নাগরিকদের দ্বারা প্রাণঘাতী ও অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কারণে সীমান্ত এলাকায় একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
তিনি এসব ঘটনার শূন্যে নামিয়ে আনার আহ্বান জানান এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন।
দুই পক্ষই সম্মত হয় যে যৌথ টহল, নজরদারি বৃদ্ধি, তথ্য বিনিময় ও জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে সীমান্তে হত্যা ও সহিংসতা কমিয়ে আনা হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
‘পুশ-ইনের ঘটনা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার পরিপন্থী’
বিজিবি মহাপরিচালক জানান, রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, যা বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল ও সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার (সিবিএমপি) পরিপন্থী।
তিনি উল্লেখ করেন, এসব ব্যক্তির মধ্যে অনেকেই মানবিক সংকটে রয়েছেন এবং তাদের দ্রুত সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেসব ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যাচাই হবে, তাদের প্রচলিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক শ্রী প্রবীন কুমার অনিষ্পন্ন যাচাইকরণ দ্রুত সম্পন্নের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, উভয় পক্ষই সম্মত হয় যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন ও যাচাইকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে।
‘বন্ধ করতে হবে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার’
বিজিবির মহাপরিচালক বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলি, ধর্মীয় বর্ণনা, রাজনৈতিক বিষয় এবং সীমান্ত-সম্পর্কিত বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে ভারতের কিছু নির্দিষ্ট প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা ও বিকৃত সংবাদ, গুজব এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি এ ধরনের অপপ্রচার রোধে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
উভয় পক্ষই সম্মত হয় যে সীমান্ত সংশ্লিষ্ট ঘটনার সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য প্রদান করা হবে, যাতে বিভ্রান্তি ও গুজব প্রতিরোধ করা যায়।
এসব ইস্যুর পাশাপাশি আরও বেশকিছিু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানবপাচার, অবৈধ অভিবাসন, রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত বেড়া ও অবকাঠামো নির্মাণ, জাল মুদ্রা ও স্বর্ণ চোরাচালান, পার্বত্য অঞ্চলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম, সীমান্ত নির্ধারণ এবং নদীর পানি বণ্টন নিয়েও মতবিনিময় হয়।
মাদক ও চোরাচালান প্রসঙ্গে উভয় দেশই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং যৌথ টহল ও তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়।
সীমান্ত বেড়া ও ১৫০ গজ এলাকার ভেতরে অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে উভয় পক্ষ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেয় এবং ভবিষ্যতে সকল কার্যক্রম আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেয়।
নদী বিষয়ক আলোচনায় কুশিয়ারা নদী থেকে পানি উত্তোলন, রহিমপুর খাল খনন এবং নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি উঠে আসে।
দুই পক্ষই যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধানে সম্মত হয়। একইভাবে সীমান্ত পিলার স্থাপন ও অনির্ধারিত সীমান্ত নির্ধারণ দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সম্মেলনের শেষে দুই পক্ষই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।