× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে

হাসনাত শাহীন

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

আষাঢ়ের আগমনী বার্তা নিয়ে চালতার ডালে ফুটেছে ফুল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আষাঢ়ের আগমনী বার্তা নিয়ে চালতার ডালে ফুটেছে ফুল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

‘এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে/ আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে/ এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি/ পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি/ নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে/ রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের পরে/ নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে/ ‘এসেছে এসেছে’ এই কথা বলে প্রাণ,/ ‘এসেছে এসেছে’ উঠিতেছে এই গান/ নয়নে এসেছে, হৃদয়ে এসেছে ধেয়ে।’Ñ বর্ষা ঋতুর প্রথম মাস আষাঢ়কে এভাবেই বর্ণনা করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বাংলা সনের হিসাব অনুযায়ী ষড়ঋতুর এই দেশে প্রথম ঋতু গ্রীষ্মের বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসের খরতাপÑ কালবৈশাখীর তাণ্ডবের নাগপাশ ঠেলে প্রকৃতিতে আসে ‘বর্ষা’ ঋতু। আজ ১৫ জুন সোমবার আষাঢ়ের প্রথম দিন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আরেক কবিতায় বলেছেন, ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।/ ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।/ বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর, আউশের খেত জলে ভরভর,/ কালি-মাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনিছে দেখ্ চাহি রে।/ ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’ কবির বাইরে না যাওয়ার এ আহ্বানে এখন হয়তো অনেকে সাড়া দেবেন না, কিন্তু বৃষ্টি ঠিকই বাগড়া দিয়ে বসবে। কারণ প্রকৃতির খেলায় এই বৃষ্টি এই রোদ চলবে বর্ষা ঋতুর দুই মাস আষাঢ়-শ্রাবণজুড়ে। রোদ, বৃষ্টি আর মেঘের শান্ত-স্নিগ্ধ খেলায় প্রকৃতি ধুয়ে মুছে নির্মল-সবুজ হয়ে ওঠে, বয়ে যায় প্রশান্তির অনাবিল পরশ। মোহনীয় ঘ্রাণ, রঙের অসংখ্য বাহারি ফুল ফোটে এসময়। এসব ফুল তার স্নিগ্ধ রূপ-সুগন্ধে মোহিত করে আমাদের প্রাণ ও প্রকৃতিকে। যে মোহনীয়তায় মাটি, নদী, বৃক্ষ, কৃষক-কৃষাণী, প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা পথিকÑ সবাই বর্ষায় যেন নতুন করে জেগে ওঠে অন্যরকম এক আবেগঘন, অনুভবসমৃদ্ধ ও চিত্রকল্পবহুল অভিজ্ঞতায়।

চিত্রকল্পে বর্ষা মানেইÑ মেঘের চোখরাঙানির সঙ্গে কখনও মুষলধারে, কখনও হালকা বা মাঝারি ধারার টানা বৃষ্টি। অঝোরধারায় বর্ষণের কারণে ঘর থেকে স্বতঃস্ফূর্ততায় বাইরে বের হতে না পারার সময়। খাল-বিল-ঝিল, নদ-নদী-নালায় থইথই পানি, স্রোত-বানের কাল। এ ছাড়াও বর্ষা এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠেÑ পুকুর-জলাশয় উপচানো জলস্রোত, রাস্তাঘাটে জলাবদ্ধতা, যেখানে-সেখানে কাদার মতো অস্বস্তিকর বিষয়। মেঘের গর্জনের সঙ্গে বৃষ্টি আর প্রকৃতির তরু-পল্লবের শাখা-প্রশাখায়; লতায়-পাতায় স্নিগ্ধতাপূর্ণ অপরূপ গাঢ় সবুজের মিতালি। বর্ষার আগমন মানেই স্নিগ্ধ-কমল কদম-কামিনী ফুল ফোটার দিন, মেঘের গুড়ুম গুড়ুম তালে ময়ূর নাচে পেখম খুলে, রিমঝিম বৃষ্টির ছন্দে প্রেমে কিংবা বিরহ-বিষণ্নে মানুষের মন ভরে ওঠে প্রাণচাঞ্চল্যে।

এমন প্রাণচঞ্চল ঋতুকে নিয়ে তাই আদিকাল থেকেই বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় রয়েছে উচ্ছ্বসিত বন্দনা, অনুরাগ ও স্তুতি। 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্ষাকে একদিকে প্রেম ও নিঃসঙ্গতার দ্বৈত আবেশগাথা ও অন্যদিকে বিদ্রোহের অগ্নিবাণ হিসেবে দেখেছেন। তার বিখ্যাত কবিতা ‘বর্ষা-সন্ধ্যা’য় লিখেছেনÑ ‘ঘন ঘোর বরিষায়/ধরা দেয় কাঁপিয়া কাঁপিয়া/ বিষণ্ন অলিন্দে তুমি,/ কার তরে হায়!’Ñ যেখানে বর্ষাপ্রেম ও নিঃসঙ্গতার দ্বৈত আবেশ একাকার হয়ে গেছে। আর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি বর্ষার মেঘ, বজ্রপাত ও জলধারাকে বিপ্লব ও দ্রোহের উপমা বা প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার বর্ষা ভয়-ডরহীন ঝড়-ঝঞ্ঝার মতো সংক্ষুব্ধ, অন্যায়, জুলুম, নিপীড়ন এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে বীরত্বময় প্রতিবাদী চেতনা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালোত্তীর্ণ রচনাসম্ভারে বর্ষা দখল করে আছে উল্লেখযোগ্য স্থান। বর্ষা ছিল কবির প্রিয় একটি ঋতু। তার বিভিন্ন গানে আছে মেঘ-মেদুর বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যের শিল্পিত বর্ণনা। বর্ষায় কবিগুরুর বাউলহৃদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠত। তাই তিনি গেয়েছেন, ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচে রে, আকুল পরান আকাশে চাহিয়া উল্লাসে কারে যাচে রে...।’

মহাকবি কালিদাস তার মেঘদূত কাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহকাতর ‘যক্ষ মেঘ’কে দূত করে কৈলাশে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। যক্ষের সে বিরহ বারতা মেঘদূত যেন সঞ্চারিত করে চলেছে প্রতিটি বিরহকাতর চিত্তে, যুগ হতে যুগান্তরে। তিনি বলেন, মেঘ দেখলে সুখী মানুষও আনমনা হয়ে যায়। তার ভাষায় ‘পুব-হাওয়াতে দেয় দোলা আজ মরি মরি।/হৃদয়নদীর কূলে কূলে জাগে লহরী।/ পথ চেয়ে তাই একলা ঘাটে বিনা কাজ সময় কাটে,/ পাল তুলে ওই আসে তোমার সুরেরই তরী...’ (শেষ বর্ষণ)।

বর্ষা; গ্রীষ্মের তাপদাহে চৌচির মাঠ-ঘাট খাল-বিল বনবীথিকায় জাগিয়ে তোলে নবীন প্রাণের ছন্দ, আবহমান বাংলার রূপ হয় অপরূপ রূপবতী সলিল দুহিতা। বর্ষার সৌন্দর্যে বিমোহিত মধ্যযুগের কবি জয়দেবের কণ্ঠে তাই ধ্বনিত হয়েছেÑ ‘মেঘৈর্মে দুরম্বরং, বণভুব শ্যামাস্ত মালদ্রুমৈ...।’

আবহমান বাংলার প্রাণ-প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন, ‘ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি।’ আষাঢ়ে জলভারানত ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশি আকাশ ছেয়ে রাখে। কখনও-বা ‘প্রাণনাথে’র মতো প্রকৃতিতে নামে বারিধারা। আষাঢ়ে প্রকৃতি ‘সজল শ্যাম ঘন দেয়া’কে সম্ভাষণ। রূপ-রঙে হয়ে ওঠে ঢলঢল। আকুতি জানায়Ñ বারিধারে এসো চারিধার ভাসায়ে, বিদ্যুৎ ইঙ্গিতে দশদিক হাসায়ে।’

শুধু রবীন্দ্রনাথ, মহাকবি কালিদাস, জয়দেব, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশই নয়, বাংলা সাহিত্যের খ্যাত-অখ্যাত বহু কবিই বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যে মোহিত-মুগ্ধ, উচ্ছ্বসিত-মুখর হয়ে বর্ষার আবাহনে সৃজন করেছেন গল্প-কবিতা; গেয়েছেন গান। যা বাঙালির জন্য অন্যান্য সব সম্পদ।

এ সম্পদ নিয়েই আজ সোমবার রাজধানীসহ সারা দেশে নানা আয়োজনে ‘বর্ষা’কে বরণ করবে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এর মধ্যে নাচ, গান, আবৃত্তি ও কথনসহ বর্ণিল আয়োজনে পহেলা আষাঢ় তথা আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে ‘বর্ষা উৎসব ১৪৩৩’ শিরোনামে বর্ষা ঋতুকে বরণ করবে ‘বর্ষা উদযাপন পরিষদ’। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে আজ সকাল ৭টা ২০ মিনিটে শুরু হবে এই উৎসব। এ উৎসবে ধরিত্রীকে সবুজ করা, জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষায় প্রতীকীভাবে শিশু-কিশোরদের মাঝে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ করা হবে।

এ ছাড়া ‘আষাঢ়ের গর্জনে নবযাত্রার ডাক, বৈষম্য বিনাশে মানুষ জেগে থাক’ শীর্ষক স্লোগানে ‘বর্ষা উৎসব-১৪৩৩’ আয়োজন করবে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ঢাকা মহানগর সংসদ। বৈষম্যহীন, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে ভোর সাড়ে ৬টায় শুরু হবে বর্ষাবন্দনার এই উৎসব। বাংলার বর্ষা, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানবিক চেতনার সম্মিলনে আয়োজিত এই উৎসবে থাকবে সংগীত, আবৃত্তি, আলোচনা এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এতে উদীচীর বিভিন্ন শাখা সংসদের শিল্পীরা ছাড়াও দেশের বরেণ্য সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্যশিল্পী ও দল অংশ নেবে।

অন্যদিকে সকাল সাড়ে ৭টায় বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে উদীচীর অন্য একটি অংশ আয়োজন করবে ‘বর্ষা উৎসব-১৪৩৩’। ওস্তাদ জাবীর ইমাম খান শাহীর রাগ ‘মিয়া কি মল্লার’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর দিনব্যাপী এ আয়োজনে পরিবেশিত হবে বর্ষার গান, কবিতা ও নৃত্য।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা