ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে বিচিত্র ঘটনার অভাব কখনো ছিল না। তথাপি সাম্প্রতিক কালের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত ঘটনাটি এমন এক অভিনব দৃষ্টান্ত, যাহা দেখিয়া সাধারণ নাগরিক প্রশ্ন করিতে বাধ্য-রাষ্ট্রের প্রশাসন প্রকৃতপক্ষে পরিচালনা করিতেছেন কে?
একদিকে
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যথাবিধি প্রজ্ঞাপন জারি করিল। বিসিএস
১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান
খানকে পদোন্নতি দিয়া বাণিজ্য সচিব
পদে নিয়োগ দেওয়া হইল। রাষ্ট্রের বিধিবদ্ধ
কাঠামো অনুসারে ইহাই চূড়ান্ত প্রশাসনিক
সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হওয়ার কথা।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যেই মন্ত্রণালয়ে তাঁহাকে
পদায়ন করা হইল, সেই
মন্ত্রণালয়ে তাঁহার যোগদানই অনিশ্চয়তার মুখে পড়িল।
প্রজ্ঞাপন বলিতেছে, ‘আপনি সচিব’। কিন্তু বাস্তবতা যেন বলিতেছে-“অপেক্ষা করুন”।
প্রশ্ন উঠিতেছে, রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থা কি এখন প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিচালিত হয়, না কি ব্যক্তিগত সম্মতি দ্বারা?
সাধারণত সচিব পদে নিয়োগ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সচিব কোনো মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মচারী নন; তিনি রাষ্ট্রের কর্মকর্তা। মন্ত্রী ও সচিব একত্রে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করিলেও নিয়োগের উৎস এবং কর্তৃত্বের ভিত্তি পৃথক।
অতএব, যখন দেখা যায় একজন প্রজ্ঞাপনপ্রাপ্ত সচিব কার্যত দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারিতেছেন না, তখন প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের উদ্ভব ঘটে।
ঘটনার আরও কৌতুককর দিক হইল, নিয়োগের আগে নয়, আপত্তি উঠিল নিয়োগের পরে। সাধারণত আপত্তির নিষ্পত্তি হইবার পরই সিদ্ধান্ত আসে; এখানে সিদ্ধান্ত আগে আসিল, বিতর্ক পরে শুরু হইল। যেন সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পর আরম্ভ হয়।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে নবনিযুক্ত কর্মকর্তাকে অবমুক্ত করিয়া দিয়াছে। অর্থাৎ তিনি আর পুরোনো দপ্তরের নন। আবার নতুন দপ্তরেও পূর্ণাঙ্গভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারিতেছেন না। প্রশাসনিক অভিধানে এই অবস্থার উপযুক্ত সংজ্ঞা থাকিলে অভিধান প্রণেতাদেরই হয়তো জানা আছে।
ফলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বর্তমানে রুটিন দায়িত্বে কার্যক্রম চলিতেছে। কিন্তু রুটিন দায়িত্বেরও সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে। বিশেষত বাজেট-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্থায়ী নেতৃত্বের অভাব প্রশাসনিক গতিশীলতাকে প্রভাবিত করিতে পারে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কিছু সূত্র আবার বলিতেছে, সংশ্লিষ্ট মহলে হয়তো ‘ভুল তথ্য’ উপস্থাপন করা হইয়াছে। এই শব্দবন্ধের সৌন্দর্য এইখানে যে, ইহা প্রায় সব পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম। কে তথ্য দিল, কী তথ্য দিল, কেন দিল- এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়াও ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক অভিধানে ‘ভুল তথ্য’ সম্ভবত এক অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত সক্রিয় প্রতিষ্ঠান। কোনো নিয়োগ আটকাল-ভুল তথ্য। কোনো বদলি বিলম্বিত হইল-ভুল তথ্য। কোনো সিদ্ধান্ত পাল্টাইল ‘ভুল তথ্য’। ফলে কখনও কখনও মনেহয়, দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অদৃশ্য ব্যাখ্যাগুলিই অধিক কার্যকর।
অবশ্য এই ঘটনা একেবারেই নজিরবিহীন নহে। প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রহিয়াছে, যাহা নাট্যকারদেরও অনুপ্রাণিত করিতে পারে। কিছুদিন পূর্বেই দেখা গিয়াছিল, সকালে কয়েকজন কর্মকর্তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হইল। অভিনন্দনের বন্যা বইয়া গেল। কিন্তু বিকালের মধ্যেই সেই আদেশ স্থগিত হইয়া গেল।
সকালে যিনি সচিব, বিকালে তিনি আর সচিব নন।
প্রশাসনের এই গতিশীলতা দেখিয়া পদার্থবিজ্ঞানের কিছু সূত্রও হয়তো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন অনুভব করিতে পারে।
ঘটনার অন্তরালে নানা ব্যাখ্যাও ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। কেহ বলিতেছেন, নবনিযুক্ত সচিব পূর্বতন ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা হওয়াই আপত্তির কারণ। কেহ বলিতেছেন, বাণিজ্য-সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ঘাটতি নিয়েই আপত্তি।
কিন্তু এই যুক্তিগুলিও প্রশ্নমুক্ত নয়।
বাংলাদেশের প্রশাসনে কতজন সচিব আছেন, যাঁহারা সমগ্র চাকরি জীবন একই খাতে অতিবাহিত করিয়াছেন? আজ যিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, কাল তিনি অর্থ বিভাগে; যিনি স্বাস্থ্যে, তিনি পরদিন সেতু বিভাগে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল দর্শনই তো হইল-একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রাষ্ট্রের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হইবেন।
অতএব, অভিজ্ঞতার প্রশ্ন যদি এক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়, তবে ভবিষ্যতে বহু পদায়নই একই যুক্তিতে প্রশ্নবিদ্ধ হইয়া পড়িতে পারে।
আরও একটি আলোচিত বিষয় হইল আত্মীয়তার প্রসঙ্গ। প্রশাসনিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন চলিতেছে যে নবনিযুক্ত কর্মকর্তা একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার নিকটাত্মীয়। কিন্তু আত্মীয়তা কোনো ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্যও করে না, যোগ্যও প্রমাণ করে না। রাষ্ট্রের বিচার হওয়া উচিত কর্মদক্ষতা, সততা এবং বিধিবদ্ধ নিয়মের ভিত্তিতে; গুঞ্জন কিংবা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ভিত্তিতে নয়।
বস্তুত, এই ঘটনাকে অনেকে কেবল একজন কর্মকর্তার যোগদান-বিলম্ব হিসেবে দেখিতেছেন না। বরং ইহাকে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য, ক্যাডার-রাজনীতি, পদায়ন-প্রতিযোগিতা এবং প্রভাব বলয়ের সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ বলিয়া বিবেচনা করিতেছেন।
কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অন্যত্র।
যদি
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একজনকে সচিব নিয়োগ দেয়,
পুরোনো মন্ত্রণালয় তাঁহাকে অবমুক্ত করে, নতুন মন্ত্রণালয়ে
যোগদান অনিশ্চিত থাকে, আর অন্য কর্মকর্তা
রুটিন দায়িত্বে কাজ চালাইতে থাকেন-তবে কার্যত প্রশাসন
পরিচালনা করিতেছে কে?
প্রজ্ঞাপন? মন্ত্রী? নাকি মন্ত্রণালয়?
নাকি সেই অদৃশ্য শক্তি, যাহার নাম কোনো সরকারি নথিতে লেখা থাকে না, কিন্তু প্রশাসনের প্রায় প্রতিটি করিডরে যাহার উপস্থিতি অনুভূত হয়?
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিধি, প্রজ্ঞাপন ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে যদি অনানুষ্ঠানিক প্রভাব অধিক কার্যকর হইয়া ওঠে, তবে ক্ষতি কেবল একজন কর্মকর্তার নহে। ক্ষতি হয় প্রতিষ্ঠানের। আর প্রতিষ্ঠান দুর্বল হইলে শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা।
আজ দেশের সচেতন নাগরিকেরা তাই কেবল এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিতেছেন না যে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে কে বসিবেন। তাহার চেয়েও বড় প্রশ্ন-রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব কোথায়?
কারণ গণপ্রশাসনের মৌলিক ভিত্তি হইল নিয়মের পূর্বানুমেয়তা। প্রজ্ঞাপন যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হয়, তবে সিদ্ধান্তের প্রকৃত উৎস কোথায়-সেই প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানিবার অধিকার আছে।
রাষ্ট্র চলে বিধি দ্বারা, গুঞ্জন দ্বারা নয়। রাষ্ট্র চলে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে, করিডরের কানাঘুষায় নয়।
আর যদি বাস্তবতা ভিন্ন কিছু বলিয়া থাকে, তবে জনগণ অন্তত এতটুকু জানিবার অধিকার রাখে-প্রজ্ঞাপন জারি করেন কে, আর প্রশাসন চালান কে?
কারণ
বর্তমান বাস্তবতায় মনে হইতেছে, প্রজ্ঞাপনই
শেষ কথা নহে; অনেক
সময় প্রজ্ঞাপনের পরই আসল গল্প
শুরু হয়।