বিশ্লেষকদের মত
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব বলে অভিহিত করেছেন শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসাবান্ধব বলে অভিহিত করেছেন শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে তারা বলেন, নতুন সরকার একটি যুগোপযোগী বাজেট দিয়েছে। এটি যথাযথ বাস্তবায়ন হলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বাড়বে। ব্যবসাবান্ধব হওয়ায় প্রস্তাবিত বাজেট দেশের বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্প কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানিতে বড় ভূমিকা রাখবে। আর নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।
বাস্তবায়নে বড় বাধা সুশাসন
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলাম প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এত বড় একটা বাজেটের বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। গত বছরের বাজেটেও বাস্তবায়নের হার ছিল খুবই নগণ্য। সেই দিক থেকে এ বছরের বাজেট নিয়ে যতই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি না কেন, এর বাস্তবায়ন একেবারেই দুঃস্বপ্নের মতো হবে। কারণ অর্থনীতি অত্যন্ত দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তবে বাজেটে দুয়েকটি ইতিবাচক দিক আছে, যেমন এবার ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা সুশাসন। যারা আগের বাজেটগুলো তৈরি ও বাস্তবায়ন করেছেন, তারাই এখন দায়িত্বে আছেন। হঠাৎ করে এমন কী পরিবর্তন হলো যে, তারা এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবেন?
অধ্যাপক আইনুল ইসলাম বলেন, গত বছর গভর্নর বলেছিলেন জুন মাসে মূল্যস্ফীতি নামিয়ে আনবেন ৬ শতাংশে। কিন্তু অর্থবছরের শেষে এসে দেখা যাচ্ছে সেটি এখনও ৯.৪৫% অর্থাৎ ১০-এর কাছাকাছি। এই পরিস্থিতির মধ্যে বাজেট কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, পরামর্শ থাকবে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার। করের জাল বিস্তৃত করতে হবে এবং নতুন করদাতাদের এর আওতায় আনতে হবে। কর ফাঁকি রোধ এবং কর রেয়াতের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া প্রয়োজন। তা হলেই রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
কর ও গ্যাস-বিদ্যুতে সরকারের পদক্ষেপ সন্তোষজনক
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, এবারের বাজেটে তৈরি পোশাক শিল্পের দুটি প্রধান প্রত্যাশা ছিল। এর একটি কর ব্যবস্থার সংস্কার। অপরটি চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সোলার সিস্টেমের আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা। দুটি বিষয়ে বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপসমূহ সন্তোষজনক। এজন্য সরকার তথা অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে ধন্যবাদ জানাই। প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে এক প্রতিক্রিয়ায়
বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, শিল্প খাতের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল উৎসে কর্তিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সমন্বয়, বহন বা ফেরতে কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা। ফেরত প্রাপ্তিটা চেক অথবা ইনস্ট্রুমেন্টাল ফর্মে হতে পারে, যা প্রয়োজনে অন্যান্য সরকারি পাওনার সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে। বিষয়টি আরও স্পষ্টিকরণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী নন বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি এবং দেশীয় বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহের সুযোগ রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিদ্যমান সুবিধাগুলো বহাল রাখা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্তও ইতিবাচক। এ ধরনের নীতিগত ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় সহায়তা করবে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বাজেটে পর্যাপ্ত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেই। বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি এখনও অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা। উচ্চ ঋণসুদও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণের ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাজেটে কিছু আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ রয়েছে। বিশেষ করে সংকটে থাকা ও বন্ধ কারখানার জন্য সহায়তা কর্মসূচি। এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে শিল্প উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে। সামগ্রিকভাবে নীতিগত দিক থেকে বাজেট ইতিবাচক।
শিক্ষায় বরাদ্দ ইতিহাসে বিরল
শিক্ষা খাতে বাজেটে বরাদ্দকে দেশের ইতিহাসে বিরল ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম। তিনি বলেন, অন্য বছরের বরাদ্দের তুলনায় শিক্ষা খাতে এ বছর গত বছরের চেয়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বেশি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সবাই মিলে সুষ্ঠুভাবে এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে জাতি গঠন ত্বরান্বিত হবে। এজন্য সদিচ্ছা ও সমন্বয় দরকার। সঙ্গে দরকার তদারকি। শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারলে কর্মসংস্থান বাড়বে।
নির্বাচনী ওয়াদা রক্ষা করছে সরকার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেছেন, মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা সম্প্রসারণ, ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালু, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, বিদেশ গমনেচ্ছুদের জন্য ১০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়া সরকারের সাহসী সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে বর্তমান বিশ্ব যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশেও সেভাবে তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হতে পারে, সেই নতুনত্বের দিকে জাতিকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা রয়েছে বাজেটে। এর ফলে আগামীতে আমরা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাব। পঞ্চম শিল্প বিপ্লবেও শিক্ষার্থীরা অংশ নিতে পারবে। একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। এতে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে।