প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ ২০:১১ পিএম
আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ ২০:২৪ পিএম
শেষ হলো আরো একটি বছর। আজ শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) খ্রিষ্টীয় নতুন বছরের শেষ। নতুন বছরে পাওয়া, না পাওয়া, অর্জন আর ব্যর্থতার হিসেব চলছে। একই সঙ্গে নব উদ্যমে নতুন বছর শুরু করতে বিস্তর কর্মপরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত সবাই। তবে বাংলাদেশের জন্য বিদায়ী বছর ছিল আশীর্বাদ। বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো বহু অর্জন যুক্ত হয়েছে ২০২২ সালে। পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের মতো বড় প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে বছরটিতে। এছাড়া নারীদের সাফ ফুটবল জয় শুধু একটি ট্রফি নয়, দেশে নারীর অগ্রযাত্রার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণও বটে। স্বাধীনতার বহু বছর পর ২০২২ সালেই বিদ্যুৎ পৌঁছেছে দেশের সব কয়টি এলাকায়। তবে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোর অগ্নিকান্ড এবং পঞ্চগড়ের নৌ দুর্ঘটনায় নিহত মানুষের ভাগ্যাহত স্বজনদের জন্য বিদায়ী বছর ছিল কষ্টের। এই ক্ষত তাদের বয়ে বেড়াতে হবে বহু বছর। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেল ও ডলারের সংকট ভুগিয়েছে দেশের সব মানুষকে।
পদ্মা সেতু
প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্ব ব্যাংকের মতো মোড়লের সরে যাওয়া ছিল বেদনাদায়ক। তার পরও সম্পন্ন হয়েছে সেতুটি। দেশের ২১ জেলাকে সড়ক পথে যুক্ত করা বহু কাঙ্ক্ষিত সেতুটি মাথা উঁচু করে বাংলাদেশের সক্ষমতার বার্তা দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। পূরণ হয়েছে জাতির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। সেতুটি নির্মাণের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষদের জীবন হয়েছে সহজতর। একই সঙ্গে অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে দ্রুত। নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা এটিই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প।
মেট্রোরেল
বছরের একেবারে শেষে মেট্রোরেল লাইন-৬ চালুর মাধ্যমে যোগাযোগের নতুন এক দুয়ার উন্মোচিত হলো ঢাকাবাসীর জন্য। জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২৮ ডিসেম্বর প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ এক অবকাঠামো চালুর পর যোগাযোগ খাতের আরেক মেগা প্রকল্প এই মেট্রোরেল। এটি চালু হওয়া ছিল বাঙালি জাতির বড় অর্জন। বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল নগরবাসীকে যানজট থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। নগরবাসীর চলাচলে গতি সঞ্চালন করা প্রকল্পটির ফলে দেশের অর্থনীতির ভিত শক্ত হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। উত্তরা-আগারগাঁও পর্যন্ত রুটে চালু হওয়া মেট্রোতে চড়তে হিড়িক পড়েছে ঢাকাবাসীর মধ্যে।
সাফ শিরোপা জয়
২০০৩ সালের পর ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় অর্জনের বছর ছিল ২০২২। ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফুটবলে রাজার আসনে বসে ছেলেরা। দীর্ঘ ১৯ বছর বছর নারীরা প্রথমবারের মতো সেই শিরোপা ঘরে তোলে। নারীদের শিরোপা শুধু একটি ট্রফি নয়। এটি ছিল গত কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা নিজেদের সক্ষমতার বড় প্রমাণ। নারীদের এই জয়ের মাধ্যমে জাতি বহু বছর পর আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের স্বাদ পায়। ১৯ সেপ্টেম্বর নেপালের দশরথ স্টেডিয়ামে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে সাফ শিরোপা নিজেদের করে নেন বাংলাদেশের মেয়েরা। শিরোপা জয়ী নারীদের ছাদখোলা বাসে সবংর্ধনা দেওয়া হয় ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের উদ্যোগে।
শতভাগ বিদ্যুতায়ন
গত বছরের ২১ মার্চ উৎপাদনে আসে দেশের সবচেয়ে বড় পায়রা কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র। এদিন দেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন নিশ্চিতের ঘোষণা দেয় সরকার। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম শতভাগ বিদ্যুতায়নের দেশ। যদিও বছর শেষে গ্রিড বিপর্যয়ে অর্ধেক দেশ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্লাকআউটে চলে যাওয়া ছিল ২০২২ সালের অন্যতম ঘটনা।
গতি এসেছে শ্রমশক্তি রপ্তানিতে
করোনা পরিস্থিতিতে এলোমেলো হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের শ্রমবাজার ২০২২ সালে আশার আলো ফিরিয়েছে। বহু বছর বন্ধ থাকার পর চলতি বছর মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি আবার শুরু হয়েছে। এ বছরই ভেঙেছে এক বছরে ১০ লাখ কর্মী পাঠানোর রেকর্ড। কয়েকটি দেশের সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, কিছু দেশের সুযোগ আরও বাড়ানো হয়।
ডলার ও জ্বালানি তেলের সংকট
টানা দুই বছর করোনার নেতিবাচক অভিঘাত কাটিয়ে ২০২২ সালের শুরুতে আর্থিক খাতের অবস্থান ছিল বেশ দৃঢ়। তবে ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারা বিশ্বের মতো টালমাটাল করে তোলে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে আমদানি ব্যয়। ভয়াবহ চাপ পড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। বছরের মাঝামাঝি হুহু করে কমতে থাকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে বছর শেষে হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভে টান পড়ায় সৃষ্টি হয় চরম ডলার সংকট। ৮৫ টাকার ডলার ওঠে ১২০ টাকায়। আমদানির ওপর কড়াকড়ি আরোপে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলতে না পারার প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে। প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ে লাগামহীন। গুজবে কান দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেন অনেক গ্রাহক, যা নতুন সংকটের জন্ম দেয়। তবে বছর শেষে এ প্রবণতা কমে আসে।
২০২০ ও ২০২১-এ যে করোনা মানুষের জীবন স্থবির করে দিয়েছিল, সেই করোনা ২০২২ সালে দুর্বল হয়ে পড়ায় নিজের শক্তি দেখাতে পারেনি। বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে এ বছর। সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের সবকিছুই উন্মুক্ত হয়েছে। শিক্ষা, পর্যটন কিংবা ব্যবসা—সবই স্বাভাবিক। তবে করোনা স্তিমিত হলেও বছরটিতে দাপট দেখিয়েছে ডায়রিয়া আর চোখ রাঙিয়েছে ডেঙ্গু।
ছিল দুর্ঘটনায় স্বজন হারানোর বেদনা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোয় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে ৪ জুন। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা কেঁপে ওঠে। আশপাশের বাড়িঘরের জানালার কাচ ভেঙে পড়ে। আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয় দমকল বাহিনীর। ৪৯ জন নিহত এবং ৭০ জনের বেশি আহত হওয়ার খবর আসে। বিএম কনটেইনার ডিপোয় ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড’ নামের বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ছিল বলে জানান ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।
২৫ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় ৫০ জনের মৃত্যু হয়। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৩০ জন। শতাধিক যাত্রী নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি বড়শশী ইউনিয়নের বদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিল। সীতাকুণ্ড অগ্নিকাণ্ড এবং পঞ্চগড়ের নৌকাডুবিতে নিহত মানুষের কাছে ২০২২ একটি হতাশার বছর।