প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:১৩ পিএম
আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:১৫ পিএম
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মানুষের জীবন সংগ্রাম, প্রতিবাদ ও স্পৃহার কথা ছবিতে এঁকেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
বৃহস্পতিবার (২৯ ডিসেম্বর) শিল্পাচার্যের ১০৮তম জন্মবার্ষিকীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদে শুরু হওয়া তিনদিনব্যাপী জয়নুল মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতির নানা শিল্পকর্ম নিয়ে শুরু হওয়া এই মেলা চলবে আগামী শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) পর্যন্ত। আয়োজন করেছে চারুকলা অনুষদ।
মেলা শুরু হয় শিল্পাচার্যের সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে। সকালে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে চারুকলা অনুষদের পাশে জয়নুল আবেদিনের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। পরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক সৈয়দা মাহবুবা করিমের নেতৃত্বে শিল্পী ও কর্মকর্তারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাবি উপাচার্য ড. অধ্যাপক আখতারুজ্জামান।
বিশেষ অতিথি ছিলেন জয়নুল আবেদিনের ছেলে ময়নুল আবেদিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক এস এম রেজাউল করিম।
এবার ‘জয়নুল সম্মাননা’ পেয়েছেন অধ্যাপক এমদাদুল হক মো. মতলুব আলী, অধ্যাপক শহীদ কবির তালুকদার। শিল্পীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।
গত বছর ‘জয়নুল সম্মাননা’ পেয়েছিলেন ভারতের শিল্প সমালোচক রমন শিবকুমার। গত বছর করোনার বিধিনিষেধের কারণে তিনি আসতে পারেননি। এবার তিনি জয়নুল মেলায় উপস্থিত থেকে সেই সম্মাননা নেন।
অনুষ্ঠানে ডা. দীপু মনি বলেন, শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্মের মধ্যে জয়নুল আবেদিন নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বাংলাদেশ গঠনের ইতিহাসে রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির যে মেলবন্ধন তার নানা পর্যায়ে, আন্দোলন-সংগ্রামে জয়নুল আবেদিনের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। এ দেশের জন্মের সঙ্গেও তার অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র রয়েছে।
তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত, বৈষ্যমহীন, গণতান্ত্রিক যে দেশ গঠনের স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন, ছবি ও রেখায় সেই স্বপ্নের কথা বলে গেছেন জয়নুল আবেদিন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, সত্তরের সাইক্লোনের ছবি যেমন তিনি এঁকেছেন, ঠিক তেমনিভাবে এদেশের মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রতিবাদ ও স্পৃহার কথাও বলে গেছেন রেখার টানে।
ভারতের শিল্প সমালোচক রমন শিবকুমার বলেন, জয়নুল আবেদিন শুধুমাত্র একজন মহান শিল্পীই নন, তিনি শিল্পের সঙ্গে গণমানুষের যে অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র রচনা করে গেছেন, তা তাকে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছে। একইসঙ্গে তিনি বাংলার লোকজ জীবনের শৈল্পিক দিকগুলোও তুলে এনেছেন নাগরিক জীবনে, লোকশিল্প জাদুঘর স্থাপন করে তাদের ঠিকানাও করে দিয়েছেন। তার নামাঙ্কিত পদক আজ আমি পাচ্ছি, এটা আমার জন্য সত্যি ভীষণ গর্বের।
মেলায় গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতির নানা শিল্পকর্ম নিয়ে হাজির হয়েছেন শিল্পীরা। এরমধ্যে উচ্ছ্বল কিশোর-কিশোরী, কলসিকাঁখে গ্রামের বধূ, গ্রামের আলপথে বাইসাইকেলে সওয়ার শিক্ষকসহ আবহমান গ্রামবাংলার গল্প টেপা পুতুলে তুলে ধরেছেন কিশোরগঞ্জের শিল্পী খোকন পাল।
জয়শ্রী মারমার কোমরতাঁতে উঠে এসেছে গহীন পাহাড়ে বসত গড়া সংগ্রামী নারীদের গল্প। শিল্পী রতনের পটচিত্রে উঠে এসেছে বাংলার পুঁথিপাঠের সংস্কৃতি।
মেলায় এসেছে শিল্পী সুশান্ত কুমার পালের শখের হাঁড়ি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রুনা বেগমের নকশিকাঁথা, রেহানা পারভিনের মনিপুরী তাঁত, মৌলভীবাজারের হরেন্দ্র কুমার দাসের শীতল পাটি। বাদ থাকেনি রংপুরের আনোয়ারের সতরঞ্জি বা ধামরাইয়ের বাবুল আক্তারের তামা-কাঁসাশিল্প।
জয়নুল মেলা উপলক্ষে চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে গতকাল বুধবার (২৮ ডিসেম্বর) থেকে শুরু হয়েছে শান্তিনিকেতন সোসাইটি অব ভিজ্যুয়াল আর্টস অ্যান্ড ডিজাইনের শিল্পীদের চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। ওই প্রদর্শনীতে ভারত ও বাংলাদেশের শিল্পীদের তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে নাগরিক জীবনের নানা অধ্যায়। মানুষের গর্ব-অহঙ্কার ও তার বিপরীতে পতনের গল্প বিমূর্ত হয়েছে অর্ঘ্যমিত্র মজুমদারের জলরংয়ে আঁকা সিরিজ ম্যান ইন পিংক গার্ব-এ। হাতে বানানো কাগজের ওপর বলপেনের আঁকিবুঁকিতে দিলীপ মৈত্র এঁকেছেন পাথুরে মানবিক জীবন ‘স্টিল লাইফ’।
শিল্পীদের মধ্যে কেউ এঁকেছেন করোনা মহামারির দুঃসহ বন্দি জীবনের কথা। অ্যাক্রেলিক শিটে রিভার্স পেইন্টিং অন ট্রান্সপারেন্ট মিডিয়ায় শিল্পী রিশি বড়ুয়ার সিরিজ ছবি দ্য ডার্কনেস-এ উঠে এসেছে সেই গল্প। করোনা মহামারির দিনগুলোতে ঘুলঘুলির ফোঁকড় দিয়ে দেখা একচিলতে নীল আকাশ আর পাখির গল্প উঠে এসেছে শিল্পী প্রসূন কান্তি ভট্টাচার্যের ‘সোশ্যাল ডিসটেন্স’ সিরিজে।
করোনার বিধিনিষেধ পেরিয়ে এসে পৃথিবী যখন আবার সচল হয়েছে, তখন মানুষে-মানুষের আত্মিক যোগাযোগের গল্প এসেছে শঙ্ঘমিত্র দাসের ছবিতে।
এছাড়াও অ্যাক্রেলিক অন ক্যানভাসে শিল্পী রিতা দত্ত এঁকেছেন নারীর মাতৃত্বের গল্প। প্লেটোগ্রাফি, এচিং মাধ্যমে উত্তম কুমার বসাক এঁকেছেন পারিবারিক বন্ধনের গল্প।