× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

টানাপড়েনে থমকে আছে এপিডি নিয়োগ

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬ ১১:৫২ এএম

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬ ১১:৫২ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর দেড় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এপিডি উইংয়ে অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ হয়নি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর দেড় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এপিডি উইংয়ে অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ হয়নি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগ প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের পদায়ন, সচিব ও অতিরিক্ত সচিব নিয়োগÑ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই অনুবিভাগ। অথচ কয়েক মাস ধরে এই বিভাগের প্রধান তথা অতিরিক্ত সচিবের পদটি শূন্য পড়ে আছে।

বিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপড়েন, আমলাতান্ত্রিক বিভাজন এবং সিদ্ধান্তহীনতার জালে গুরুত্বপূর্ণ এই নিয়োগ আটকে ছিল। ফলে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও অদ্যাবধি এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। 

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর দেড় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এপিডি উইংয়ে অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ হয়নি। প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে প্রশ্ন উঠেছে যোগ্য কর্মকর্তার অভাব, নাকি রাজনৈতিক বিবেচনা?

বিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এপিডির অতিরিক্ত সচিব পদে পদায়নের লক্ষ্যে তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ সরকারকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। বর্তমানে তিনি খাদ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মাঠ প্রশাসনে দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার জন্য পরিচিত ফিরোজ সরকারকে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, এপিডি অনুবিভাগের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আনা হয়েছিল। কিন্তু যোগদানের পরপরই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত হিসেবে পরিচিত এক কর্মকর্তাকে ওই পদে বসানোর জন্য প্রশাসনের ভেতরে একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ফিরোজ সরকারকে পদায়নের পক্ষে ছিলেন বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক ও কর্মরত কয়েকজন প্রভাবশালী আমলা। তাদের যুক্তি ছিল, যে লক্ষ্য সামনে রেখে বিভাগীয় কমিশনার পদ থেকে তাকে জনপ্রশাসনে আনা হয়েছে, তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বসানো প্রশাসনিক শুদ্ধাচারের পরিপন্থী। এই মতভেদের জেরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের শীর্ষ আমলা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং জনপ্রশাসন সচিবের মধ্যে এক ধরনের ‘টাগ অব ওয়ার’ শুরু হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে, যে শেষ পর্যন্ত এপিডির অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব খোদ জনপ্রশাসন সচিবের কাছেই রাখা হয়। সেই থেকে পদটি কার্যত শূন্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এপিডি হলো প্রশাসনের হৃৎপিণ্ড। এখানে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্ন তোলা হলে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফিরোজ সরকারকে নিয়ে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল মূলত ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারের লড়াই।

এপিডি অনুবিভাগে অতিরিক্ত সচিব না থাকায়, নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ সংক্রান্ত বহু ফাইল ঝুলে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সচিব পদে বিপুলসংখ্যক শূন্যতা থাকা সত্ত্বেও দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। জনপ্রশাসন সচিবকে একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে।

সূত্র বছে, এপিডির ফাইলগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। এগুলোতে দ্রুত সিদ্ধান্ত না হলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অচলাবস্থা তৈরি হয়। অতিরিক্ত সচিব না থাকায় ফাইল নিষ্পত্তিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগছে।

সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য রাখা হলে আমলাতন্ত্রে অনিশ্চয়তা বাড়ে। যেখানে পদোন্নতি ও পদায়নের প্রশ্ন, সেখানে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকলে কর্মকর্তাদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন শীর্ষ এক আমলার অসহযোগিতার কারণে ফিরোজ সরকারকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আবার অনেকে বলছেন, প্রকৃতপক্ষে ‘যোগ্য লোকের অভাব’Ñ এমন যুক্তি সামনে এনে বিষয়টি দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে।

সূত্র বলছে, অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তার ঘাটতি নেই। বরং রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের কারণে সিদ্ধান্ত আটকে আছে। নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত নিয়োগের প্রত্যাশা তৈরি হলেও এখনও কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রশাসনে যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু যদি রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে যোগ্যতার প্রশ্ন গৌণ হয়ে যায়। এপিডির মতো সংবেদনশীল বিভাগে এ ধরনের দ্বিধা পুরো ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, নতুন সরকার চাইলে প্রথম দিকেই এই পদ পূরণ করে একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারত। 

রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সচিব পদে শূন্যতা, মাঠ প্রশাসনে পদায়ন জটিলতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অনুবিভাগে নেতৃত্বের সংকটÑ সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপিডি অনুবিভাগে দ্রুত অতিরিক্ত সচিব নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। অন্যথায় নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে পারে। প্রশাসনের কাঠামো তখনই কার্যকর থাকে, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরগুলো স্পষ্ট ও দায়িত্ব নির্ধারিত থাকে। এপিডি উইং প্রধানের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি রেখে দীর্ঘদিন চলা মানে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়া।

বিশ্লেষকদের মতে, এপিডি অনুবিভাগের মতো স্পর্শকাতর বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিলে বিতর্ক এড়ানো সম্ভব। বর্তমানে জনপ্রশাসন সচিবকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় কাজের চাপ বেড়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে নীতি বাস্তবায়ন ও কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক সচিব বলেন, জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব নিজেই এপিডি উইং প্রধানের দায়িত্ব রাখা নজিরবিহীন ঘটনা। কারণ সিনিয়র সচিবকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এপিডি নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কাটাতে না পারলে এর প্রভাব পুরো প্রশাসনে পড়বে। সরকার যদি কার্যকর ও গতিশীল প্রশাসন চায়, তাহলে এই পদ পূরণে আর দেরি করা উচিত তবে না। দলীয় আনুগত্য নয়, যোগ্য ও মেধাবীকে দ্রুত এই পদে পদায়ন করা প্রয়োজন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সব মিলিয়ে এপিডি অনুবিভাগে অতিরিক্ত সচিব পদ শূন্য থাকা কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি প্রশাসনের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নীতি নির্ধারণের গতিপথের প্রতিফলন। নতুন সরকারের জন্য এটি একটি পরীক্ষাও বটেÑ তারা কি পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সমাধান দেবে, নাকি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে বিষয়টি আরও দীর্ঘায়িত হবে? 


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা