× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ব্যক্তি-নির্ভরতা ও ভুল সিদ্ধান্ত

হারিয়ে গেছে অনেক শক্তিশালী রাজনৈতিক দল

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:২২ এএম

নেতৃত্ব সংকট, ক্রমাগত জনবিচ্ছিন্নতা, রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে উপমহাদেশের রাজনীতিতে একসময় সক্রিয় থাকা অনেক দল পরবর্তীকালে আর রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

নেতৃত্ব সংকট, ক্রমাগত জনবিচ্ছিন্নতা, রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে উপমহাদেশের রাজনীতিতে একসময় সক্রিয় থাকা অনেক দল পরবর্তীকালে আর রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতায় খুঁজলে এমন অনেক রাজনৈতিক দলের সন্ধান পাওয়া যায়, একসময় যেসব দলের নামে প্রকম্পিত হতো রাজপথ। জনমানুষের অধিকার আদায়ে যারা ছিল অগ্রগণ্য। অথচ আজকের রাজনীতির ময়দানে তাদের অস্তিত্ব নেই। 

ইতিহাসের নির্মোহ বিশ্লেষণ বলছে, এসব দলের একটি বড় অংশ গড়ে উঠেছিল নিছক ‘ব্যক্তি-নির্ভর’ কাঠামোর ওপর। আদর্শিক চর্চার অভাব, দুর্বল সাংগঠনিক ভিত্তি ও একক নেতৃত্বের ওপর অতি-নির্ভরতা মূলত এসব প্রাচীন রাজনৈতিক দলকে কালের গর্ভে নিয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়ায় তাদের অস্তিত্ব কেবল ইতিহাসের বইয়ে সীমাবদ্ধ।

ঔপনিবেশিক শাসনামলে মেহনতি বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এক অবিস্মরণীয় নাম ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (কেপিপি)। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে ব্রিটিশ বাংলার বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠা কৃষক ও প্রজা সমিতিগুলোর সমন্বয়ে এই রাজনৈতিক দলের ভিত্তি রচিত হয়। ১৯৩৫ সালে কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ‘লাঙল যার, জমি তার, ঘাম যার, দাম তার’Ñ এই স্লোগান নিয়ে ১৯৩৬ সালে দলটি ঘোষণা করে তাদের সুনির্দিষ্ট ইশতেহার। জমিদারি প্রথা বিলোপ, মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিকে দলটির রাজনীতির মূল ভিত্তিতে রাখা হয়। ‘চাষী’ নামের একটি পত্রিকা দলটির মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হতো।

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বের গুণে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত কেপিপি পুরো ভারতবর্ষে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সময়ের বিবর্তনে ১৯৫৩ সালে ফজলুল হকের বাসভবনে এক সম্মেলনের মাধ্যমে দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘কৃষক শ্রমিক পার্টি’। 

১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক প্রাদেশিক নির্বাচনে ‘যুক্তফ্রন্ট’ জোটের শরিক হিসেবে কৃষক শ্রমিক পার্টি ৩০৯টি আসনের মধ্যে ৪৮টিতে জয়লাভ করে নিজেদের শক্তির জানান দেয়। এ কে ফজলুল হক, আবু হোসেন সরকার, আতাউর রহমান খান ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়া আবদুস সাত্তারের মতো প্রথিতযশা রাজনীতিবিদরা ছিলেন এই দলের প্রাণপুরুষ। কিন্তু ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর যখন ফজলুল হক গৃহবন্দি হন, তখন থেকেই দলটির পতন শুরু। মূলত এরপর আর এই দলের কোনো কার্যকর সাংগঠনিক অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

অদ্ভুত হলেও বাস্তবতা হলো, আজ বাংলাদেশে কৃষক শ্রমিক পার্টির কোনো দৃশ্যমান রাজনীতি নেই। তবুও নির্বাচনের আগে নামসর্বস্ব এই দলটিকে ঘিরে নানা তৎপরতা দেখা যায়। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়, যেখানে ফারাহনাজ হক চৌধুরীকে সভাপতি ও মোহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ সুজনকে মহাসচিব ঘোষণা করা হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত দলের তালিকায় ঐতিহাসিক এই দলটির কোনো নাম নেই।

রাজনৈতিক দলটির ঐতিহাসিক উত্থান-পতন প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, সময়ের প্রেক্ষাপটে কৃষক প্রজা পার্টির কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করা। কিন্তু নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে এই দলটিও শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন সময়ে দলের নীতির বিরুদ্ধে আপস করেছেন।

ড. সাব্বির আহমেদ আরও উল্লেখ করেন, ‘১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালের মন্ত্রিসভার ব্যর্থতা ও মুসলিম লীগের (যারা জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের বিরোধী ছিল) সঙ্গে জোট গঠন দলটির বিলুপ্তিতে বড় ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ১৯৪৬ সালের পাকিস্তান আন্দোলনের প্রবল প্রভাবেও অনেক ছোট ছোট দল তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়ে ফেলে।’

একইভাবে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া আরেকটি নাম ‘গণতন্ত্রী দল’। ১৯৫৩ সালের ১৯ জানুয়ারি মাহমুদ আলি ও হাজি মুহাম্মদ দানেশ প্রতিষ্ঠিত এই দলটি ছিল পাকিস্তানের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তি। মুসলিম লীগের পাশ্চাত্যপন্থী নীতির বিরোধিতা ও স্বাধীন বৈদেশিক নীতির দাবিতে তারা সোচ্চার ছিল। দলটির ইশতেহার ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীলÑ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সামন্ততন্ত্র বিলুপ্তি, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও নারী-পুরুষের সমান অধিকারের মতো দাবিগুলো ছিল সময়ের চেয়ে অগ্রগামী। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ১৩টি আসনে জয়ী হওয়া এই দলটির লাল-নীল পতাকায় মিশে ছিল কৃষি ও মেহনতি মানুষের মিত্রতার প্রতীক। কিন্তু শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে না ওঠায় এটিও এখন শুধুই ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুলতান মাহমুদ রানা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, উপমহাদেশের রাজনীতিতে একসময় সক্রিয় থাকা অনেক দল পরবর্তীকালে আর রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল নেতৃত্বের সংকট, ধীরে ধীরে জনগণের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ও একাধিক বড় রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত। এসব সীমাবদ্ধতার ফলেই দলগুলো সময়ের সঙ্গে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।

১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের যে দুটি আসনে হারে তার একটিতে জয়লাভ করে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে এ দলটি প্রতিষ্ঠা করেন নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান। দলটির পূর্ব পাকিস্তানে প্রধান হিসেবে ছিলেন নূরুল আমিন। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন। ১৯৪৮ সালে নুরুল আমিন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন। তিনি পাকিস্তানের ৮ম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি পাকিস্তানের একমাত্র উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাঙালি হয়েও তিনি ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেন। ১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। সে সময় নূরুল আমিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির ১২ সদস্য এর একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দেশ স্বাধীন হলে নুরুল আমিন পাকিস্তানে বসবাস করতে থাকেন। ১৯৭৪ সালের ২ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কৃষক প্রজা পার্টি, গণতন্ত্রী দল, পিডিপির মতো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঠাঁই এখন শুধু পাঠ্যবইয়ে। রাজনীতির ময়দানে শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোর বদলে ব্যক্তিকে অতি-মূল্যায়ন করাসহ নানান ভুল পদক্ষেপের খেসারত হিসেবেই এ দলগুলো জনমানুষের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা