সড়ক-মহাসড়কে টোল বাণিজ্য
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:০৯ এএম
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:২৮ পিএম
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। ছবি: বাসস
উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ আর রাজস্ব আদায়ের যুক্তিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে টোল আদায়ের বাস্তবতা দীর্ঘদিনের। কিন্তু এই বাস্তবতাকে ঢাল বানিয়ে ক্ষমতাধর রাজনীতিক-ব্যবসায়ীরা বর্তমানে টোল আদায়কে অভাবনীয় অবৈধ আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন। গত দেড় দশকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১৯টি টোল প্লাজা ও এক্সপ্রেসওয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের হাতে-যেগুলোর প্রতিটির নেপথ্যে ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত হয় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সড়ক ও মহাসড়কে টোল ব্যবসা আদৌ বন্ধ হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, আগের সিন্ডিকেটই সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের প্রকৌশলীদের সঙ্গে সমঝোতা করে টোল আদায় অব্যাহত রাখে। এখন নতুন রাজনৈতিক সরকারের আমলেও সেই সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।
পনের বছর রাজত্ব করেছে পাঁচ প্রতিষ্ঠান
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ টোল প্লাজাগুলো পরিচালনা করেছে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সিএনএস কোম্পানি, নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ইউডিসি লিমিটেড, সাবেক মন্ত্রী মির্জা আজমের শামীম এন্টারপ্রাইজ, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আশীর্বাদপুষ্ট এটিটি ও এমএম বিল্ডার্স এবং আরও একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু টোল আদায়ের দায়িত্বেই ছিল না; বরং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) একটি অংশের সঙ্গে যোগসাজশে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, দরপত্র বাতিল, নতুন প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য ঘোষণা ইত্যাদি আওয়ামী আমলের সিন্ডিকেট বহাল কাজ করে থাকত। এ সময় বহু সক্ষম প্রতিষ্ঠানকেই বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে দরপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
নতুন দরপত্রের ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীন ছিল অন্তর্বর্তী সরকার
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল শত শত কোটি টাকা লুটপাট, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকা জমা না দেওয়া ও চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করার। পাশাপাশি সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টার নির্দেশে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ তখন ওই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা সব টোল বরাদ্দ বাতিলও করেছিল। তবে কাগজে-কলমে এটি বড় সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন ঘটেনি। কারণ পুরনো সিন্ডিকেটভুক্ত সওজের প্রকৌশলীদের রহস্যজনক ভূমিকার কারণে নতুন দরপত্রের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার।
নামে দায়িত্বে সরকার কিন্তু কাজে আগের লোকজন
অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়ম বহির্ভূত টোল ইজারা বাতিল হলেও টোল প্লাজাগুলোর দৈনন্দিন পরিচালনা আগের কোম্পানির স্টাফদের দিয়েই করানো হচ্ছে। তারা এখনও একই জায়গায়, একই পদ্ধতিতে কাজ করছে। শুধু পার্থক্য- বেতন যাচ্ছে পে-রোলের মাধ্যমে। এই ব্যবস্থাপনায় টোল পরিচালনার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের প্রকৌশলীরা। অভিযোগ, এই প্রকৌশলীরা আগের মতোই হিসাব গোপন, আদায় কম দেখানো, অঘোষিত টাকা তোলা ইত্যাদি কাজে নীরবে সহযোগিতা করছেন। নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকদের সুনজরে পড়ার জন্যে তারা জোর লবিংও অব্যাহত রেখেছেন।
সূত্র জানায়, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কয়েক মাস পর সড়ক ও মহাসড়কে টোল আদায়ের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র যাচাই-বাছাই করতে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতা ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানও বাছাই করে কমিটি। কিন্তু সাবেক সিন্ডকেটের প্রভাবে সেখানেই থেমে যায় সব প্রক্রিয়া। একের পর এক যাচাই-বাছাইয়ের নামে চলতে থাকে কালক্ষেপণ। কারিগরির দোহাই দিয়ে সাবেক উপদেষ্টা ও সচিবকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করা হয়। পুনঃপুনঃ তদন্তের কথা বলে সময় নষ্ট করা হয়। এ পরিস্থিতিতে সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ বিভাগের সচিব অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অভিযোগ, সওজের প্রধান প্রকৌশলী ও বিভিন্ন প্রকৌশলীদের কারসাজি ও আন্তরিকতার অভাবেই বিষয়টি থমকে আছে। নতুন সরকার আসার পরও টোল প্লাজার ক্ষেত্রে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বিভিন্ন জোন অফিস ও সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাহী প্রকৌশলদের রহস্যজনক ভূমিকায় নতুন দরপত্র আটকে আছে। পুরনো সিন্ডিকেটটি এখনও মনে করছে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে তারা আবারও টোল ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক স্তরে প্রতিরোধ না হলে এই ধরনের সিন্ডিকেট ভাঙা কঠিন। জানা গেছে, নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
কোটি কোটি টাকার গরমিল ও হিসাবের ফাঁক
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বিভিন্ন সেতু ও সড়ক থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি টোল
আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অর্থ বিভাগের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সম্ভাব্য আদায় আর সরকারি কোষাগারে জমার মধ্যে বড় ফাঁক। কোথাও হাতে লেখা রসিদ, কোথাও নির্ধারিত টোলের বাইরে 'অঘোষিত আদায়'। ব্যস্ত সময়ে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও টোল আদায়ের হিসাবে তার প্রতিফলন নেই। তা ছাড়া ডিজিটাল টোল ব্যবস্থা শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি জবাবদিহির প্রশ্ন। ইচ্ছা না থাকলে প্রযুক্তিও দুর্নীতির ঢাল হয়ে যায়।
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উন্নয়ন অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক নোটিস থেকে জানা গেছে, টোল আদায়ের টেন্ডার প্রক্রিয়া, চুক্তি বাস্তবায়ন, রাজস্ব আদায় ও অর্থ জমাদানে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির সভা হয়। অতিরিক্ত সচিব মো. এরশাদুল হকের সভাপতিত্বে সভায় বাজেট ও অডিট অনুবিভাগ, এমআইএস অনুবিভাগ, পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ উইং ও সওজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত উচ্চপর্যায়ের উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করছেন। কিন্তু কমিটির সেই সভার ফলাফল পরে আর জানা যায়নি।
পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার কি সক্ষম হবে কোটি কোটি টাকার টোল আদায়ের অনিয়মের জন্য দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে? পারবে কি অনিয়ম বন্ধ করতে? নাকি আগের মতোই তা ধামাচাপা পড়ে যাবে? টোলের টাকায় যদি আবারও সিন্ডিকেট টিকে যায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাবে- সরকার বদলায়, কিন্তু ব্যবস্থা বদলাবে কবে?