আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৭ এএম
মায়ের স্মৃতিবিজড়িত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বসবাসের জন্য উঠবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত বাসভবন গণভবন হলেও সেখানে কখনও থাকেননি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তবে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ছিল তার পছন্দের জায়গা। এখানে না থাকলেও সরকারি অনেক কাজকর্ম করেছেন এই যমুনাতেই। এখানে বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, নৈশভোজ, রাষ্ট্রীয় অনেক আচার-অনুষ্ঠান ছাড়াও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। যমুনার অনেক গাছগাছালির পরিচর্যাও করেছেন নিজের হাতে।
মায়ের এমন স্মৃতিবিজড়িত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বসবাসের জন্য উঠছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার নিরাপত্তাসহ সাপোর্টিং স্টাফদের জন্য যমুনা সংলগ্ন দুইটি বাংলো বাড়িও যুক্ত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কমপ্লেক্সটি হতে যাচ্ছে প্রায় ৬ একরের মতো। এর মধ্যে শুধু যমুনাই সোয়া তিন একর। সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা যমুনায় বসবাস করতেন। আজ শুক্রবার তিনি যমুনা ছেড়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ড. ইউনূস যমুনা ছেড়ে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর জন্য উপযোগী করে সংস্কারের জন্য প্রায় দুই মাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। সে পর্যন্ত তারেক রহমান থাকবেন গুলশানের বাসভবনে।
প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা থাকবেন তারেক রহমানের খুব কাছাকাছি। কয়েকজন মন্ত্রী গুলশান ও ধানমন্ডিতে বাসা বরাদ্দ নিলেও বেশিরভাগ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের এক কিলোমিটারের কম ব্যাসার্ধের জায়গায় বসবাস করবেন। এর মধ্যে সবচে সিনিয়র স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থাকবেন ৩৫ হেয়ার রোডে। তিনি ছাড়াও হেয়ার রোডে আরও থাকবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম ৫ হেয়ার রোড, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ১ হেয়ার রোড, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ৬ হেয়ার রোড, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ ২ হেয়ার রোডের বাসায় থাকবেন। আরও কয়েকজনের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে হেয়ার রোড়ের কয়েকটি বাংলো।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের পেছনের মিন্টো রোড়ে থাকবেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। তিনি থাকবেন ১ মিন্টো রোডে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল ৪ মিন্টো রোড, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ৩৪ মিন্টো রোড, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ৪১ মিন্টো রোডে থাকবেন। ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ ৭ মিন্টো রোড, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু ২ মিন্টো রোড, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ৫ মিন্টো রোডের বাংলোবাড়িতে থাকবেন। আগে থেকেই মিন্টো রোডের ৩৩ নম্বর বাংলোতে থাকছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনার সামনের বেইলি রোড়ে সবচে বড় বাড়িটি পেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি থাকবেন ২৪ বেইলি রোডের বাংলোতে। এটা যমুনার সবচে কাছের বাড়ি। একই সড়কের ২৫ নম্বর বাড়িতে থাকবেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। ঢাকায় শাহজাহানপুরে আলিশান বাড়ি থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস বেইলি রোডে বাড়ি বরাদ্দ নিয়েছেন। আরেকজন রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানকেও বেইলি রোডে বাংলোবাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গুলশানের অভিজাত এলাকায় বাসা বরাদ্দ পেয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একইভাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও গুলশানে বাড়ি বরাদ্দ পেয়েছেন। নিজ নির্বাচনী এলাকা ধানমন্ডিতে বাড়ি বরাদ্দ নিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষের কাছাকাছি থাকছেন তিনি।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তর নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বাসা বরাদ্দ দিলেও সেগুলো সংস্কার করে বসবাস উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তর। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের প্রাধিকার অনুযায়ী বাসার আসবাবপত্র সরবরাহসহ বসবাস উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য কাজ শুরু করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। হেয়ার রোড, বেইলি রোড ও মিন্টো রোডের সরকারি বাসাগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত হচ্ছে নগর গণপূর্ত বিভাগ। তারা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে।
নতুন প্রতিমন্ত্রীদের জন্য হেয়ার রোডে রয়েছে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট। তিনটি দশতলা ভবনে সুপরিসর ৩০টি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। সরকারের ২৫ জন প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এই অ্যাপার্টমেন্টগুলো। অপেক্ষাকৃত নতুন এই অ্যাপার্টমেন্টগুলোর খুব একটা সংস্কার কাজ নেই। শুধুমাত্র হাইজেনিক ওয়াশ করে আসবাবপত্র দিয়ে সাজিয়ে দিলেই বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টারা এখানে উঠতে পারবেন। তবে সবার ক্ষেত্রেই একটি ডেডলাইনের কথা বলা হচ্ছে আর সেটা হচ্ছে ঈদের পরে। সে হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই সবচে দেরিতে সরকারি বাসায় ওঠার সুযোগ পাবেন।
সংসদ এলাকা থেকে যমুনা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী কোথায় থাকবেন তা নির্ধারণের জন্য গত বছরের ৭ জুলাই একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তারা প্রথমে সংসদ ভবন কমপ্লেক্সে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন দুটি একত্রিত করে প্রধানমন্ত্রীর জন্য বাড়ি করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তা প্রধানমন্ত্রীর উপযোগী না হওয়ায় অবশেষে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও হেয়ার রোডের ২৪ ও ২৫ নম্বর বাংলোকে এক করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন করার সুপারিশ করে। তারই প্রেক্ষিতে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধান উপদেষ্টা যমুনা ছেড়ে নিজ বাসভবনে উঠবেন। তার পরপরই শুরু হবে সংস্কার কাজ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করে প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। নতুন কমপ্লেক্সে সংযুক্ত দুটি বাংলো প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্তদের রাখা হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তর যমুনা সংস্কারের জন্য দুই মাস সময় চেয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী চলতি রমজানে ইফতার অনুষ্ঠান ও আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরে অতিথিদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান যমুনায় করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। সে আলোকে দ্রুতই যমুনার সংস্কারকাজ শেষ করার উদ্যোগ নিয়েছে নগর গণপূর্ত অধিদপ্তর।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মেহেবুবুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন সংস্কার করে তার বসবাস উপযোগী করতে আমাদের দুই মাসের মতো সময় লাগবে। তবে তিনি রমজানে ইফতারির আয়োজন ও ঈদে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারবেনÑ এমন সংস্কার কাজ দ্রুতই সম্পন্ন হবে।