হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২১ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে এবার বইমেলা ২৫ দিন পিছিয়েছে, সেই সঙ্গে ব্যাপ্তিকাল নেমে এসেছে ১৮ দিনে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
লেখক-প্রকাশক-পাঠক আর সাহিত্যপ্রেমীদের অপেক্ষার পালা শেষ করে আজ বৃহস্পতিবার শুরু হতে যাচ্ছে বাঙালির প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৬।’ সাধারণত ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন শুরু হয়ে শেষ দিন পর্যন্ত চলে এই মেলা।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে এবার তা ২৫ দিন পিছিয়েছে, সেই সঙ্গে ব্যাপ্তিকাল নেমে এসেছে ১৮ দিনে।
জনগণের ভোটে ভূমিধস জয়ের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এবারের বইমেলা উদ্বোধন করবেন।
উদ্বোধন শেষে মেলা প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করবেন তিনি। এদিকে অমর একুশে বইমেলা ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। সেই সঙ্গে জানিয়েছে, বইমেলায় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই।
আজ দুপুর ২টায় শুরু হবে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করবেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এই অনুষ্ঠানেই ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’ প্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধনের পরেই সর্বসাধারণের জন্য খুলে যাবে মেলার দুই প্রাঙ্গণÑ বাংলা একাডেমি চত্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রবেশপথ। তারপর থেকেই মূলত শুরু হবে আপামর বাঙালির প্রাণের মেলা, যা চলবে স্বাধীনতার মাস মার্চের ১৫ তারিখ পর্যন্ত। এ সময় বইমেলার দুই প্রাঙ্গণের বাতাসে ভেসে বেড়াবে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ। এসব বই নিয়ে প্রতিদিন জমবে লেখক-প্রকাশক-পাঠক আর সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনা-আড্ডা।
মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, এবারের বইমেলায় অংশ নিচ্ছে মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ৮১টি প্রতিষ্ঠানের স্টল এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রকাশনা সংস্থার স্টল। মোট ইউনিট ১ হাজার ১৮টি। গত বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ৭০৮টি এবং ইউনিট ছিল ১ হাজার ৮৪টি। মেলায় এবারও লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের অবস্থান থাকছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায়। সেখানে ৮৭টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শিশু চত্বরে মোট প্রতিষ্ঠান ৬৩টি এবং ইউনিট ১০৭টি।
ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। ছুটির দিন বইমেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে যথারীতি রাত ৯টা পর্যন্ত। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের অবাধে চলাচল এবং বই কেনার জন্য প্রতি শুক্র ও শনিবার মেলায় বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে। এবং অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি এবং সংগীত প্রতিযোগিতা।
বাংলা একাডেমি আরও জানিয়েছেÑ প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার এবং বিকাল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বরাবরের মতো এবারও বইমেলায় বাংলা একাডেমি এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫% কমিশনে বই বিক্রি করবে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বই বিক্রয় হবে তাদের নির্ধারিত কমিশনে।
বাংলা একাডেমির সচিব ও বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. সেলিম রেজা জানান, এবার বইমেলার বিন্যাস গতবারের মতো অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। তবে কিছু আঙ্গিকগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ ছাড়া বিগত বছরের মতো এবারও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পবিত্র রমজান উপলক্ষে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে মেলায় আগত মুসল্লিদের জন্য সুরা তারাবি নামাজের ব্যবস্থা থাকবে। বরাবরের মতো এবারের বইমেলার প্রবেশ ও বাহির পথে পর্যাপ্তসংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। এ ছাড়া নিরাপত্তার জন্য মেলায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বইমেলা পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে।
এদিকে মেলার শুরুর আগের দিন গতকাল বুধবার বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে দেখা গেছে, প্রকাশকরা বিরামহীনভাবে সাজিয়ে তুলছেন নিজেদের স্টল। কোনো কোনো প্রকাশনা সংস্থার স্টলে চলছে শেষ মুহূর্তের নির্মাণকাজ। কোনোটায় পড়ছে শিল্পীদের রঙতুলির শেষ ছোঁয়া।
নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা বইমেলা
গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, বইমেলায় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। উস্কানিমূলক বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে, এমন কোনো বই পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মেলায় মব সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা ঘটানোর কোনো সুযোগ থাকবে না বলেও তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।
ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিবারের মতো এবারও সার্বিক নিরাপত্তার জন্য সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং পরিচালিত হবে। পুরো এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন করবেন গোয়েন্দা সদস্যরা। তাদের পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াট টিম এবং সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা মোতায়েন থাকবেন। প্রায় ৩০০টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চালানো হবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেসব দিনে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। এ ছাড়া মেলা এলাকায় ফুট প্যাট্রলিং এবং মুক্তমঞ্চকেন্দ্রিক বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, বইমেলা উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও রাজু ভাস্কর্য সংলগ্ন সড়কে কোনো ভারী যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না।