একুশে বইমেলা
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১১ এএম
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২৪ এএম
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে চলছে অমর একুশে বইমেলার স্টল নির্মাণের কাজ । ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সকল জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের প্রথম সারির প্রকাশকসহ প্রায় সকল প্রকাশকের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। এ লক্ষ্যে বইমেলার দুই প্রাঙ্গণে (বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এখন চলছে স্টল নির্মাণের তুমুল তোড়জোড়।
মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, এবারের মেলায় কোনো প্যাভিলিয়ন থাকবে না। সাড়ে চার শতাধিক প্রকাশনা সংস্থার পাশাপাশি এবারের বইমেলায় মোট ৫৪৯টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। তাদের জন্য বইমেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও বাংলা একাডেমির পাশের ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মোট এক হাজার আঠারো ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির সচিব ও এবারের অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. সেলিম রেজা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুর দুইটায় এই মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।
মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের স্টল নির্মাণের কাজ করছে। হাতে সময় কম; কিন্তু আমরা আশা করছি, প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় স্টল নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করবে।’ এবার মেলায় ১ ইউনিট, ২ ইউনিট, ৩ ইউনিট, ৪ ইউনিট এবং ৫ ইউনিট স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার মেলার দুই প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, জোরেশোরে চলছে মেলায় বরাদ্দ পাওয়া বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার বিভিন্ন ইউনিটের স্টলগুলো নির্মাণের কাজ। সঙ্গে স্টলের বাইরের ফাঁকা স্থানে এবং মেলা প্রাঙ্গণে রাস্তা নির্মাণের জন্য ইট বিছানোর কাজও চলমান। অন্যদিকে, মেলায় প্যাভিলিয়ন না রাখার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভাঙা হয়েছে প্যাভিলিয়ন পাওয়া প্রকাশনা সংস্থাগুলোর প্যাভিলিয়নও।
স্টল নির্মাণের কাজে ব্যস্ত বেশ কয়েকজন শ্রমিকের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘হাতে মাত্র আর দুই দিন সময় আছে। এরই মধ্যে আমাদের কাজ শেষ করতে হবে বলে তাগাদা দিচ্ছে মালিক পক্ষ। তাই আমাদের এখন দম ফেলার সময় নাই।’
এবারের মেলায় প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ পেয়েছিল প্রকাশনা সংস্থা ‘অন্বেষা’। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমরা প্যাভিলিয়ন পেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার ও বাংলা একাডেমি অন্যান্য প্রকাশকের দাবির মুখে এবার মেলায় প্যাভিলিয়ন না রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আজ (গতকাল) প্যাভিলিয়ন ভাঙার কাজ করছি। আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) ৫ ইউনিটের স্টল নির্মাণের কাজ শুরু করব। হাতে মাত্র দুই দিন সময়; খুবই কম সময়। জানি না যথাসময়ে স্টল নির্মাণ করতে পারব কি না। তবে আমরা চেষ্টা করব, মেলা শুরুর আগেই একটা মানসম্মত স্টল নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করতে।’
‘প্রকাশক ঐক্যে’র অন্যতম নেতা অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন বলেন, ‘অবশেষে সরকার আমাদের দাবি মেনে নেওয়ায় আমরা বইমেলায় অংশ নিচ্ছি। ইতোমধ্যে স্টল বরাদ্দও পেয়েছি। হাতে মাত্র দুই দিন সময় আছে, জানি না এই সময়ে কীভাবে স্টল নির্মাণ করব। তবে রাতদিন কাজ করে মেলা উদ্বোধনের আগে স্টলের কাজ শেষ করার জোর চেষ্টা করব। আশা করি পারব।’
স্টল বরাদ্দের অস্বচ্ছতা নিরসন এবং প্যাভিলিয়ন না রাখাসহ বেশ কিছু শর্ত মেনে নেওয়ায় এবারের বইমেলায় অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে দেশের মূলধারার সৃজনশীল প্রকাশকরা। দেশের প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক মূলধারার সৃজনশীল প্রকাশক নিয়ে গঠিত ‘প্রকাশক ঐক্য’ গতকাল সোমবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেয়। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে অনুষ্ঠিত হয় এই সংবাদ সম্মেলন। এতে সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহ্রুখ মহিউদ্দীন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন আহমদ পাবলিশিং হাউজের প্রকাশক মেছবাহউদ্দীন, অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন, বাতিঘর প্রকাশনীর প্রকাশক দীপঙ্কর দাশ, আদর্শ প্রকাশনীর মাহাবুব রাহমান প্রমুখ।
এ সংবাদ সম্মেলনে ‘প্রকাশক ঐক্যে’র পক্ষে ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অমর একুশে বইমেলা কমিটির সদস্য মাহ্রুখ মহিউদ্দীন বলেন, ‘এবার বইমেলায় সবার সমান অধিকারের স্বার্থে প্রকাশক ঐক্য কোনো প্যাভিলিয়ন নেবে না এবং অন্য কাউকেও প্যাভিলিয়ন না দেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু যখন দেখা গেল, প্যাভিলিয়ন ভাঙা হচ্ছে না এবং তাদের শর্ত মানা হচ্ছে না, তখন মেলায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়। তবে গত রবিবার রাতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) আন্তরিকতায় একটি সমঝোতা হয়েছে। সরকার আমাদের শর্ত মেনে নিয়েছে। তাই প্রকাশক ঐক্য বইমেলায় অংশ নিচ্ছে।’
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন জানান, প্রকাশকদের প্রাথমিক চাওয়া ছিল বাস্তবতার নিরিখে বইমেলা ঈদের পর আয়োজন করার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে তারা সাড়া পাননি। পরে নতুন সরকার শপথ গ্রহণের পর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী প্রকাশকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এ সময় প্রকাশকরা তিনটি শর্ত দিলে সরকার তা পূরণের আশ্বাস দেয়। এরপর দুই শতাধিক প্রকাশক চলতি মাসের ১৯ তারিখে আবেদন জমা দেন।
এর আগে গত শনিবার স্টল ও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দে অস্বচ্ছতা নিরসন না হওয়া এবং সময়স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে অমর একুশে বইমেলায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল সংগঠনটি।
প্রকাশনা শিল্পে বৈষম্য দূর করার দাবি : সংবাদ সম্মেলন থেকে সৃজনশীল বইয়ের বাজার প্রসারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারি ক্রয় বাজেট বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে ‘প্রকাশক ঐক্য’। আসন্ন বইমেলার উদ্বোধক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়ে প্রকাশকরা তার কাছে দুটি দাবি উত্থাপন করেছেন। এগুলো হলোÑ এক. পুরস্কার হিসেবে বই : স্কুল-কলেজের বার্ষিক প্রতিযোগিতাসহ রাষ্ট্রীয় সকল অনুষ্ঠানে পুরস্কার হিসেবে ‘সৃজনশীল বই’ প্রদানের বিষয়ে সুস্পষ্ট সরকারি নির্দেশনা; এবং দুই. বাজেট বৃদ্ধি : সরকারিভাবে বই ক্রয়ের বাজেট দীর্ঘ বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে এই বাজেট বাস্তবসম্মতভাবে বাড়ানো।
সংবাদ সম্মেলনে অতীতের স্মৃতিচারণ করে প্রকাশকরা বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়কালে শিল্প-সংস্কৃতি ও মেধার স্বীকৃতি হিসেবে বই উপহার দেওয়ার যে রেওয়াজ শুরু হয়েছিল, তা এই শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছিল।’