ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৯ এএম
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৩ এএম
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলের নির্বাচনী ইশতেহারকে ‘জাতীয় প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তা বাস্তবায়নে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সচিবদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল সোমবার সচিবদের এ-সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হয়। বলা হয়, সরকারি দলের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ জাতীয় পর্যায়ের প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে। সরকারের পক্ষে এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা দ্রুত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্রগুলো বলছে, মন্ত্রণালয়গুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে। পরে তা পর্যালোচনা করে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে। ইতোমধ্যে সরকারের নির্দেশনাকে ‘অতীব গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চিহ্নিত করায় মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। একাধিক সচিব এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে সম্ভাব্য প্রকল্প ও নীতিগত পদক্ষেপ চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করেছেন।
নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রশাসনিক সংস্কারের মতো একাধিক অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে তিন স্তরে পরিকল্পনা সাজাতে বলা হয়েছে। যেমন এক বছরের স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ, নীতিমালার সংশোধন, প্রশাসনিক নির্দেশনা, পাইলট প্রকল্প। ১-৩ বছরের মধ্যমেয়াদি প্রকল্পে থাকছেÑ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বড় প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন, বাজেট পুনর্বিন্যাস। ৩-৫ বছর বা তদূর্ধ্ব দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে থাকবে কাঠামোগত সংস্কার, আইন প্রণয়ন/সংশোধন, টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি।
এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সরকার বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। তাদের মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে স্বল্পমেয়াদে চাল ও গমের সরকারি মজুদ বাড়ানো, ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল মনিটরিং জোরদারের প্রস্তাব তৈরি করেছে। মধ্যমেয়াদে আধুনিক খাদ্যগুদাম নির্মাণ ও সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন, আর দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যরা বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, বাণিজ্য ও খাদ্য এই তিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
অর্থ ও পরিকল্পনা খাতে কাঠামোগত সংস্কারের ভাবনা : অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, করব্যবস্থা সহজীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিকে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পে রূপ দিতে হলে প্রাধান্য নির্ধারণ জরুরি। সবকিছু একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। তাই অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ই-গভর্ন্যান্স সম্প্রসারণ, ফাইল নিষ্পত্তিতে সময়সীমা নির্ধারণ এবং দুর্নীতিবিরোধী নজরদারি জোরদার করার মতো পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় থাকতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তায় জোর : নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন, আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তা জোরদারের অঙ্গীকার থাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, স্বল্পমেয়াদে থানাভিত্তিক সেবার মানোন্নয়ন, অনলাইন জিডি ও মামলা ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং অপরাধ বিশ্লেষণে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
মধ্যমেয়াদে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক তদন্ত প্রযুক্তি সংযোজন, সাইবার অপরাধ দমন ইউনিট শক্তিশালীকরণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অপরাধ তথ্যভান্ডার (ক্রাইম ডেটাবেজ) গড়ে তোলা এবং নাগরিকবান্ধব পুলিশিং সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণের আলোচনা চলছে।
মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে আমরা জাতীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছি।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজার সংযোগ : খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি ইশতেহারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়ায় কৃষি মন্ত্রণালয় বহুমাত্রিক পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বল্পমেয়াদে সার ও বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষিঋণ সহজীকরণ এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ সেবা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। মধ্যমেয়াদে জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন, সেচব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী খাতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে গবেষণা, কৃষি-ডিজিটাল প্লাটফর্ম এবং সরাসরি বাজার সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন পরিকল্পনায় থাকতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কৃষিকে শুধু উৎপাদন নয়, মূল্যসংযোজন ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে জাতীয় প্রতিশ্রুতির বড় অংশ বাস্তবায়ন সম্ভব।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়-তৃণমূল উন্নয়নে সমন্বিত কর্মসূচি : ইশতেহারে স্থানীয় উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব থাকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও সক্রিয় হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বল্পমেয়াদে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সেবা ডিজিটালাইজেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং গ্রামীণ সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
মধ্যমেয়াদে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প সম্প্রসারণ, নগর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে বিকেন্দ্রীকরণ জোরদার, স্থানীয় করব্যবস্থা সংস্কার এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচনী ইশতেহারকে জাতীয় প্রতিশ্রুতি হিসেবে বিবেচনার নজির খুব বেশি নেই। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সমন্বয় ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ দ্রুত ফল দেখাতে পারে, কিন্তু মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে দেয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা একসঙ্গে কাজ না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময়েও বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নে ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ ছিল। যে কারণে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে এখন প্রশ্নÑ এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে? তবে জনপ্রশাসনের একটি অংশ খুবই আশাবাদী। তাদের মতে, শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তদারকির ব্যবস্থা থাকলে এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সক্রিয় ভূমিকা রাখলে অগ্রগতি দৃশ্যমান হতে বাধ্য।
এখন দেখার বিষয় সচিবদের টেবিলে তৈরি হওয়া স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা কত দ্রুত মাঠপর্যায়ে বাস্তব রূপ পায় এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কতটা নাগরিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।