আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:১৫ পিএম
বাবা নাজিউর রহমান মঞ্জুর ও ছেলে আন্দালিভ রহমান পার্থ। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
২০০১ সাল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারের শেষ দিনগুলোতে রাজনৈতিক জোট গঠন নিয়ে নানা টানাপোড়েন। সেনা কর্মকর্তা জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলার ভয় দেখিয়ে চার দলীয় জোট থেকে বের করে নেওয়া হয় এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। এরশাদের বিশ্বস্ত সহচর নাজিউর রহমান মঞ্জুর সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী ডা. এমএ মতিনকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় পার্টি থেকে আলাদা হয়ে গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। থেকে যান বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোটে।
এরশাদের এতো কাছের
মানুষ হয়েও নাজিউর রহমান মঞ্জুর আলাদা দল গঠন করে খালেদা জিয়ার হাতকে শক্তিশালী করার
এই প্রচেষ্টা নিয়ে কম কথা শুনতে হয়নি শেখ পরিবারের জামাই নাজিউর রহমান মঞ্জুরকে। ২০০১
সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অস্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চার দলীয় জোট দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
নিয়ে সরকার গঠন করে। মতিন-নাজিউরের জাতীয় পার্টি চারটি আসনে জয়লাভও করে। নির্বাচনের
পর ৬০ সদস্যের বিশাল মন্ত্রিসভায় স্থান হয়নি নাজিউর রহমান মঞ্জুর এমনকি তার দলের কোনো
এমপির।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোট আবারও দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
নিয়ে জয়লাভ করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ৫০ সদস্যের এই মন্ত্রিসভায়
স্থান পাননি নাজিউর পূত্র ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ। বাবার মতো পার্থও শেখ
পরিবারের জামাই। শেখ পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য শেখ হেলালের জামাতা তিনি। বাবা বঞ্চিত
হয়েছিলেন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত সরকার গঠনের সময়ে। আর ছেলে বঞ্চিত হলেন সেই খালেদা
জিয়ার সুযোগ্য সন্তান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের প্রাক্কালে।
কেন এমন হলো—এ প্রশ্ন ঘুরে ফিরেই আসছে বার বার। একটি বহুল প্রচলিত ইংরেজি প্রবাদ
আছে ‘হিস্টরি রিপিটস ইটসেলফ’ অর্থাৎ ইতিহাস বার বার ফিরে আসে। ১৭ ফেব্রুয়ারি রেওয়াজ
ভেঙ্গে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান আর ব্যারিস্টার আন্দালিভ
রহমান পার্থর কথা ভাবলে প্রবাদটির গভীরতা প্রকাশ পায়। অথচ গত ১৭ বছর আন্দালিভ রহমান
পার্থ কী করেননি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য। প্রবাসে থাকা তারেক রহমানকে নিয়ে জাতীয়
সংসদে বক্তৃতা। আত্মীয়তার বন্ধনকে উপেক্ষা করে টিভি টকশোতে শেখ হাসিনার শাসনামলের সবচেয়ে
বড় সমালোচক ছিলেন তিনি।
রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম,
কারাবরণ থেকে শুরু করে কত মামলার যে আসামি হয়েছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সর্বশেষ নিজের
গোছানো ঢাকা-১৭ আসন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ছেড়ে দিয়ে সেই ভোলা-১ আসন থেকে
নির্বাচন করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। পার্থ যেখানেই যান, সেখানেই সফল হন।
যেমনটা হয়েছিলেন ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বিএনপির ভরাডুবির মধ্যে ওয়ান
ম্যান আর্মির মতো তার দল বিজেপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। সালমান এফ
রহমানের নেতৃত্বে শেয়ার বাজার লুটের ঘটনা জাতীয় সংসদে প্রকাশ করে বলেছিলেন, একজন ‘দরবেশ’
সব লুটপাট করে খাচ্ছে। তিনিই প্রথম বলেছিলেন, ৪০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত
বাজেটের উপর সাধারণ আলোচনায় সংসদে দেওয়া পার্থর বক্তব্যটি রাজনৈতিক মহলেই নয়, নেটিজেনদের
মধ্যেও আলোড়ন তুলেছিল। তার সেই বক্তব্য কোটি কোটি মানুষ দেখেছিল। এখনও দেখছে। সোশাল
মিডিয়ায় নতুন নতুন পেইজে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে আপলোড হচ্ছে। ১৪ বছর আগে দেওয়া বক্তব্যের
আবেদন কমেনি মোটেই। সেদিন জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনার চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, “তারেক
রহমান দেশে ফিরবেন এবং বীরের বেশেই ফিরবেন। তারেক রহমানের মতো জনগণের একজন নেতার রাজনৈতিক
ভবিষ্যৎ কোনো বিচারকের কলমের খোঁচায় নির্ধারিত হয় না। বরং তা নির্ধারিত হয় আল্লাহর
ইচ্ছা ও জনগণের মাধ্যমে।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের ১০ দিন পরেও ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থর কোনো মূল্যায়ন
না হওয়ায় বিস্মিত সাধারণ মানুষও। তবে এতোসবের পরেও সবাই বলছেন, সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন শোনা যাচ্ছে জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার করা হবে তাকে। বিএনপির
জোট সঙ্গী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, নূরুল হক নূর সরকারর প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। আন্দালিভ
রহমান পার্থকে ডেপুটি স্পিকার করা হলে সেটা যথাযথ মূল্যায়ন হবে। কারণ, ডেপুটি স্পিকারের
পদটি সরকারের পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদার। সাকি-নূরুদের চেয়ে তার অবদান অনেক অনেক বেশি।
তবে মন্ত্রিসভায়
স্থান পাওয়া, না পাওয়া-নিয়ে মন খারাপ নেই ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থর। রবিবার
সকালে তাকে ফোন করা হলে তিনি জানান, মূল্যায়নের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সামনে আরো
সময় আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিশ্চয়ই কোনো পরিকল্পনা রয়েছে। তাকে ডেপুটি স্পিকার
করা হচ্ছে কি—না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারের কোনো পর্যায়
থেকে এখনো তাকে কিছু জানানো হয়নি। পিতার মতো বঞ্চিত হচ্ছেন কি না—এমন প্রশ্নে খানিকটা থেমে বললেন, “আমি এখনো শিওর না। সরকারের মাত্র
তো শুরু। সময় তো শেষ হয়ে যায়নি।”