× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শিক্ষা প্রশাসন কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৬ এএম

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৭ এএম

শিক্ষা প্রশাসন কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত

গত এক দশকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অধীনস্থ অধিদপ্তরগুলোর দায়িত্ব ও কর্মপরিধি বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন, ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন।

কিন্তু এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্প্রসারণ হয়নি প্রশাসনিক কাঠামো। ফলে একক কাঠামোর ওপর পড়া চাপ ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সচিব কমিটি সভায় শিক্ষা প্রশাসনে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্মতি দেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়কালে অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির সভায় নতুন পদ সৃষ্টি, অতিরিক্ত শীর্ষ তিন পদ অনুমোদন, দুটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর তথা ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং কলেজ পর্যায়ের জন্য ‘কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর’ গঠনের প্রস্তুতি এবং সরকারিকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের স্বীকৃতিÑ এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিগত ও প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। কার্যপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক কাঠামোগত বাস্তব সংকটে ভুগছে। একজন মহাপরিচালকের পক্ষে দেশের সব মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি কার্যত অসম্ভব। ফলে অনেক সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে দেরি হয় বা পৌঁছায়ই না। এই বাস্তবতায় অধিদপ্তরের জন্য অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার থেকে রাজস্ব খাতে স্থায়ীভাবে তিনটি অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদÑপ্রশাসন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, এবং প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন-সৃষ্টিতে সম্মতি দেয়। তবে অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ শেষ পর্যন্ত দুটি পদে সম্মতি দেয়। এই দুটি পদের বেতন স্কেলও অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ নির্ধারণ করেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একজন মহাপরিচালকের ওপর এত বড় দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে ফলপ্রসূ শিক্ষা ব্যবস্থাপনা আশা করা অবাস্তব। অতিরিক্ত মহাপরিচালক নিয়োগ হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে গতি আসবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সবচেয়ে আলোচিত ও কাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি এসেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে ভেঙে দুটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বিষয়ে। বর্তমানে একই অধিদপ্তর থেকে মাধ্যমিক (স্কুল-মাদ্রাসা) এবং কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছেন, এই দুটি স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, সমস্যা ও নীতিগত চাহিদা আলাদা; অথচ একই প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে দুটিকে পরিচালনা করায় কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা নিয়ে কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (সিইডিপি) আয়োজিত ‘শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার প্রভাব বিশ্লেষণ’ শীর্ষক জাতীয় কর্মশালায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ আসে। পরে বিয়াম ফাউন্ডেশন গবেষণা ও পরামর্শ সেবা কেন্দ্র (বিএফআরসিএসসি) তাদের প্রতিবেদনে বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তে পৃথক অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব দেয়।

সূত্র মতে, জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০-এ আনুষ্ঠানিকভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে বিভক্ত করে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ ও ‘উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক দাখিলকৃত মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনাতেও ডিসেম্বর ২০১৯ সালের মধ্যে দুটি পৃথক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। যদিও সেই সময়সীমায় সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন হয়নি। সবশেষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নীতিগত অনুমোদনের পর মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং কলেজ পর্যায়ে ‘কলেজ শিক্ষা অধিদপ্তর’ নামে দুটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নতুন গতি পায়। এ লক্ষ্যে দুটি পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যতালিকা প্রণয়নের প্রস্তাব চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়। সেটি সম্প্রতি সচিব সভায় অনুমোদন পেয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে শিক্ষা প্রশাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে বলেও জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারিকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের স্বীকৃতি সংক্রান্ত বিষয়েও একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারিকরণের আগে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি নিয়মিতকরণ দীর্ঘদিনের একটি জটিল ও সংবেদনশীল ইস্যু। এ জন্য সচিব সভায় ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ৪৯১টি পদ সৃষ্টি করে এসব শিক্ষক-কর্মচারীকে রাজস্ব কাঠামোর আওতায় আনার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেনÑ এটি শুধু প্রশাসনিক নয়, সামাজিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষক সংগঠনের এক নেতা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য এটি বড় স্বস্তির খবর।’

এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো ঘিরেও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দিয়েছে সরকার। বিভাগের কাজের পরিধি বহুগুণে বেড়ে যাওয়ায় দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছেÑ এমন বাস্তবতার কথা তুলে ধরে সচিব সভার শুরুতেই এই বিভাগে ১৪৩টি নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে রাজস্ব খাতে স্থায়ীভাবে ২৭টি ক্যাডার পদ এবং অস্থায়ীভাবে ৫১টি পদসহ মোট ৭৮টি পদ সৃষ্টিতে সম্মতি দেয়। তবে ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় বিবেচনায় অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ শেষ পর্যন্ত রাজস্ব খাতে স্থায়ীভাবে ২২টি ক্যাডার পদ এবং অস্থায়ীভাবে ৩৯টি পদসহ মোট ৬১টি পদ সৃষ্টির অনুমোদন দেয়।

পরবর্তীতে অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ এসব পদের জন্য প্রয়োজনীয় বেতন স্কেলও নির্ধারণ করে, ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার একটি বড় ধাপ সম্পন্ন হয়। শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই ৬১টি পদ মূলত পরিকল্পনা, প্রশাসন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও সমন্বয়মূলক কাজে ব্যবহৃত হবে, যা বিভাগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে সহায়ক হবে।

একাধিক সূত্র বলছে, যদিও এসব সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে শিক্ষা প্রশাসনে বড় সংস্কারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন অধিদপ্তর গঠন, জনবল নিয়োগ, দায়িত্ব বণ্টন, বাজেট সংস্থানÑ সবকিছুই সময়সাপেক্ষ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি, গতি ও মানÑ তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, পরিকল্পনা যতই শক্তিশালী হোক, বাস্তবায়নের ঘাটতি থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। শিক্ষা খাতে এই বড় প্রশাসনিক রদবদল শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ সরকারের অগ্রাধিকার ও নজরদারির ওপর।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা