ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:১৯ পিএম
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২৭ পিএম
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রথম অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার তোলা। ছবি : বাসস
প্রশাসনিক স্পন্দনের কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক সকাল ছিল শনিবার। এদিন শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, সরকারি ছুটির দিন হলেও সকাল ১০টা ১০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রথমবারের মতো অফিস করতে এসে দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। মহান শহীদ দিবসের আবহে এই আগমন যেন দায়িত্ব, ইতিহাস ও প্রতীকী অঙ্গীকারের সম্মিলিত এক বার্তা পৌঁছে দেয় দেশবাসীকে।
কার্যালয়ে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। আনুষ্ঠানিকতা ছিল, তবে অনাড়ম্বর। হাস্যোজ্জ্বল অভ্যর্থনায় ক্ষমতার দূরত্ব যেন কিছুটা কমে আসে। রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়েও প্রথম দিনেই তিনি কাজের মধ্য দিয়ে যে দায়িত্ববোধের প্রকাশ ঘটালেন, তা প্রশাসনিক অঙ্গনে জন্ম দিয়েছে নতুন আলোচনার।
সংস্কার-অসম্পূর্ণ কার্যালয়ে নতুন সরকারের বাস্তবতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতায় এখানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ আঠারো মাসেও পুরো সংস্কার কাজ শেষ হয়নি। এই ভবনে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নামফলক ছিল। রাজনৈতিক সরকারের জন্য প্রস্তুত করে রাখার দায়িত্ব থাকলেও তা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি- এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরও পুরোপুরি প্রস্তুত অবকাঠামো না থাকায় প্রধানমন্ত্রীকে দুই দিন সচিবালয়ে অফিস করতে হয়েছে। শনিবারের এই উপস্থিতি ছিল তার তৃতীয় কর্মদিবস। ছুটির দিনেও সময় নষ্ট না করে দাপ্তরিক কাজে মনোনিবেশ- এটি প্রশাসনিক তৎপরতারই ইঙ্গিত বহন করে।
পুরনো প্রাঙ্গণে নতুন সংলাপ-মানবিকতার স্পর্শ
মূল ভবনে প্রবেশের আগে করিডোরে থেমে যান প্রধানমন্ত্রী। তার প্রয়াত মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। অনেককে নাম ধরে ডাকেন, হাসিমুখে খোঁজখবর নেন। প্রোটোকলের কঠোর আবহে মুহূর্তটির মানবিকতা উপস্থিতদের জন্য ছিল আবেগঘন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আচরণ কেবল সৌজন্য নয়- এটি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও অভিজ্ঞতার প্রতি আস্থার বার্তা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও রাষ্ট্রযন্ত্রের স্মৃতি ও সক্ষমতাকে সম্মান জানানোর ইঙ্গিত এতে স্পষ্ট।
স্বর্ণচাঁপার চারা-প্রতীকে স্থিতি ও সৌরভের প্রত্যাশা
কার্যালয় চত্বরে একটি স্বর্ণচাঁপা ফুলের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম, পিএসসি, জি (অব.)সহ অন্য কর্মকর্তারা। স্বর্ণচাঁপা-সুগন্ধ ও স্থায়িত্বের প্রতীক। প্রশাসনিক যাত্রার সূচনায় এই বৃক্ষরোপণ যেন স্থিতিশীলতা, সৌরভময় সাফল্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্জনের প্রত্যাশার রূপক হয়ে ওঠে।
ভাষার প্রতি অঙ্গীকার-স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। ভাষা শহীদদের স্মরণে এই আয়োজন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ভাষার অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতি পুনর্ব্যক্ত অঙ্গীকার হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২১ ফেব্রুয়ারির আবহে দায়িত্ব গ্রহণ ও ভাষা স্মরণ- এই দুইয়ের মিলনে দিনটি পেল ঐতিহাসিক মাত্রা। প্রশাসনিক সূচনা আর সাংস্কৃতিক চেতনার সংযোগ এক নতুন রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। তেজগাঁওয়ের প্রথম কর্মদিবসে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে- প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার স্বীকৃতি, মানবিক যোগাযোগের অগ্রাধিকার ও ইতিহাস-সচেতন প্রতীকী উদ্যোগ। ক্ষমতার প্রাঙ্গণে প্রথম পদচারণা সাধারণত আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এদিনের সকাল ছিল সংলাপ, স্মৃতি ও প্রতীকের সমন্বয়ে নির্মিত। করিডোরে করমর্দন, স্বর্ণচাঁপার চারা রোপণ, ভাষার স্মারক- সব মিলিয়ে এটি কেবল এক প্রধানমন্ত্রীর প্রথম অফিস-দিবস নয়; বরং এক রাজনৈতিক সময়ের সূচনা। তেজগাঁওয়ের আকাশে তাই শনিবারের সকালটি হয়ে রইল এক নতুন অধ্যায়ের প্রতিধ্বনি।
শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান নিয়ে বৈঠক
শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দমুখর ও কর্মমুখী করে গড়ে তোলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের বিষয়ে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ়করণ বিষয়ক সভা
দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ়করণ বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।