মনসুর মুসা
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৭ এএম
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৮ এএম
একুশের ভাস্কর্য: জননী ও গর্বিত বর্ণমালা। ছবি: সংগৃহীত
একুশে ফেব্রুয়ারির যে মূল লক্ষ্য আমরা সেটা থেকে বিচ্যুত হয়েছি। আগে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে স্কুল-কলেজে তো বটেই, পাড়া-মহল্লা থেকেও দেয়াল পত্রিকা এবং প্রচুর ছোট ছোট পত্রিকা বের হতো। সেই পত্রিকাগুলোতে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ভাষা সংক্রান্ত বিষয়ে লেখা থাকত। আজকাল এই ধরনের কোনো পত্রপত্রিকা চোখে পড়ে না। দেয়াল পত্রিকা প্রকাশের কথাও শোনা যায় না, দেখাও যায় না। এর মানেÑ এখনকার যে সমাজ; এই সমাজ বাংলা ভাষা সম্পর্কে, বাঙালির সংস্কৃতি সম্পর্কে এবং বাঙালির সভ্যতা সম্পর্কে অনেকটাই উদাসীন। সেজন্য সর্বত্র ভুল বাংলা অর্থাৎ ভুল বাংলাতে সবকিছু হচ্ছে। সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে সাধারণ বিজ্ঞাপন-বিজ্ঞপ্তি, ফেস্টুন-ব্যানার যত রকমের যোগাযোগের মাধ্যম আছে সব খানেই বাংলা ভাষা ব্যবহারে উদাসীনতা। এটি খুব ভালো বিষয় নয়। অর্থাৎ যে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা বাংলাকে নিজেদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেয়েছিলাম এবং যে ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে আমরা যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেলামÑ সেই শপথ, সেই কর্তব্য যেন আমরা ভুলে গেছি।
এই যে ভুলে
যাওয়া, সেটা কেমন? একটি উদাহরণ হাজির করি। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে।
পাবলিক, প্রাইভেট দুই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ই, যাদের অধিকাংশ নামই ইংরেজি শব্দে। এখন
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই নামগুলো কারা দিচ্ছেনÑ নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠার
পেছনের উদ্যোক্তা, তারাই দিচ্ছেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন বা সরকারও
এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিচ্ছে। এই যে উচ্চ পর্যায় থেকে অনুমতি মিলছে, যারা
এই অনুমতি দিচ্ছেন, তারাও কি বিষয়গুলো একবারও দেখেন না? যে, এই নামগুলো বাংলায় কেন
হচ্ছে না? অথচ সব বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে অবস্থিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকও
বাংলাদেশি কিন্তু নামগুলো বিদেশি। ফলে আমরা আমাদের ভাষা সম্পর্কে; নিজেদের পরিচয়
সম্পর্কে এবং যে গর্ব নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল সেই বোধ ক্রমেই নষ্ট হয়ে
যাচ্ছে।
শুধু
বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই বা কেন বলি, আমরা যদি এখনকার বিজ্ঞাপনগুলোর দিকে চোখ রাখি,
তাহলে দেখা যাবে সেখানেও একটি হযবরল অবস্থা।
প্রশ্ন ওঠা
স্বাভাবিক এজন্য দায়ী কে বা কারা? আসলে বাংলা ভাষা পড়ে যদি কেউ উচ্চ শিক্ষা লাভ
করে তার জন্য চাকরির ব্যবস্থা না থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি বাংলার শিক্ষক না
থাকেÑ তাহলে বাংলা ভাষা চর্চা করবে কে, বাংলা ভাষা শিক্ষা দেবে কেÑ এটাও তো একটা
বড় প্রশ্ন? আমাদের বাংলা ভাষার রাষ্ট্র যদি বাংলা ভাষাকে শ্রদ্ধা না করে, সম্মান
না করে; তার জন্য দাবি সৃষ্টি না করেÑ তাহলে ভাষা নিয়ে গর্বের জায়গাটা থাকবে কী
করে? এ জায়গায় থাকতে হলে তো আমাদের সকল ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলনের কথা ভাবতে
হবে, সবখানে বাংলা ভাষাকে চাইতে হবে। এজন্য দেশের সাধারণ জায়গা থেকে শুরু করে
অফিস-আদালত; সকল জায়গায় বাংলা ভাষার বিশেষজ্ঞ পদ দরকার; থাকা দরকার। তা হলে বাংলা
ভাষার প্রতি মানুষের যে আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে তা রোধ হবে। সরকারকে এ নিয়ে উদ্যোগ
নিতে হবে- সবার আগে এবং আমাদের সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। তা না হলে-বর্তমান সময়ের
প্রেক্ষিতে কে বাংলা ভাষা চাইবে; বিশ্ববিদ্যালয় চাইবে, শিল্প কারখানা যেগুলো আছে
তারা চাইবে; না।
আমাদের সমস্যা
কিন্তু বিদেশি ভাষা নয়। বিদেশি ভাষা জানা-শেখাও দোষের নয়। কিন্তু নিজের ভাষাটাকে
তো আগে শক্তিশালী করতে হবে। নিজের ভাষাটাকে তো আগে ভালো করে শিখতে হবে প্রজন্ম
থেকে প্রজন্মের কাছে ভালোমতো তুলে দিতে হবে। তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা শক্ত
অবস্থানে দাঁড়াব কী করে?
পৃথিবীতে অনেক
রাষ্ট্র আছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের কথাই বলি। সেখানে কি এমন বিশ্ববিদ্যালয়
খুঁজে পাওয়া যাবে, যেখানে ইংরেজি নেই? যুক্তরাষ্ট্রেও এমন বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে
পাওয়া যাবে না, যেখানে ইংরেজি নেই। একইভাবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, বা ইউরোপের
অন্যান্য দেশÑ সবখানেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজির চর্চা চলছে। ইংরেজি তারা চায়
বলেই ইংরেজির দরকার হচ্ছে। আরেকটা বিষয়, আমরা যখন কেউ বিদেশে যেতে চাই, বিশেষত
পড়ালেখার জন্য বা কাজের জন্য, তখন সে দেশের সেই বিদেশি ভাষাটা শিখতে হয়। ইংল্যান্ডে
ইংরেজি শিখে যেতে হয় এবং অন্যান্য দেশে ইংরেজি শিখে যেতে হয়। যদি ভাষাটা শিখে
যাওয়া যায়, তাহলে ওখানে জীবনটা সহজ হয়। কিন্তু বাংলাদেশে যখন কেউ আসে তার কি বাংলা
শিখতে হয়? হয় না। হয় নাÑ কারণ, আমরা বাংলা ভাষার সেই চাহিদাটা তৈরি করতে পারিনি।
আমরা পারিনি বাংলাদেশে আসতে হলে বাংলা ভাষাটা একটু শিখে আসতে হবে এমন শর্ত তুলে
ধরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে। আমরা যদি এগুলো পারি তাহলে বাংলার একটা চাহিদা
সৃষ্টি হবে। যদি বাংলা ভাষার এমন চাহিদা সৃষ্টি করতে না পারি তাহলে বাংলা ভাষাও
শক্তিশালী হবে না, বরং এর যে শক্তি ছিল তাও ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাবে। যদিও যেসব
কারণে বাংলা ভাষা পৃথিবীর মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল আমরা সেসব বিষয় হারিয়ে
ফেলছি।
একসময় এক মাস
ধরে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের প্রক্রিয়া চলত। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই প্রায় প্রতিটি
স্কুল-কলেজ, ক্লাব, বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির ওপর
ছোট ছোট পুস্তিকা বের করত এবং সেগুলো বিক্রি হতো এখন সেটা কেউ করে না। না করলে
বাংলার চর্চাটা শক্তিশালী হবে কী করে, হবে
না।
বাংলা ভাষাকে
শক্তিশালী করতে হলে আমাদের এখন অনেক কিছু করতে হবে প্রথম কথা হলো, রাষ্ট্রের
ধারণা বুঝতে হবে। এই রাষ্ট্রÑ বাংলা ভাষার ওপর, বাঙালির শপথের ওপর এবং বাঙালির
সংগ্রামের ওপর, বাঙালির রক্তদানের ওপর গড়ে উঠেছে এবং সেই কারণেই আজ ২১ ফেব্রুয়ারি
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হয়েছে। যাকে কেন্দ্র করে বা যে ইতিহাসকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক
মাতৃভাষা ঘোষণা হলো তাকে আমাদের কর্মক্ষেত্রে রাখতে হবে। অর্থাৎ বাংলা ভাষায় যদি
কেউ চাকরি না পায় তাহলে সে বাংলা ভাষা কেন শিখবে?
আজ ফেব্রুয়ারি গেলে পরের দিন আমরা ফেব্রুয়ারির কথা ভুলে যাই; ভাষার মাসের কথা ভুলে যাই। আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে। এখন আমরা যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্রটাকে শক্তিশালী করতে চাই তাহলে বাংলা ভাষার জন্য চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের চেতনাকে জাগ্রত করতে হবে; মনে রাখতে হবে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকেও। বাংলা ভাষা শুধু নয়; যেকোনো ভাষার যদি উন্নয়ন করতে হয় তাহলে অফিস-আদালতের দাপ্তরিক কাজ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সকল ক্ষেত্রে সেই ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে, চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে। চলার পথের বাহন থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটের বিভিন্ন জায়গার নামও সেই ভাষায় লিখতে হবেÑ সেই ভাষা ও সেই ভাষাগত জাতির সংস্কৃতিকে সামনে রাখতে হবে। তাহলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব হবে। বলা বাহুল্য, আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসা প্রকাশ করি। কিন্তু শুধু ভক্তি-প্রেম-ভালোবাসায় ভাষা উন্নত হয় না। ভাষা পরিচর্যা করতে হয়। নতুন বাংলাদেশের যারা নতুন প্রজন্ম তারা এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে দেখবেন।
ভাষাবিজ্ঞানী ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি