× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাষ্ট্রের প্রশাসন সাজানো হচ্ছে মেধা ও যোগ্যতার সমন্বয়ে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৫ এএম

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৬ এএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয় থেকে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে থানা, এক কথায় রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রায় সব স্তরেই বড় ধরনের রদবদলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এমপি ও মন্ত্রিদের শপথের আগের রাতেই প্রশাসনের এ-সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ে নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকরা আলোচনা করেছেন। এমন খবরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে একদিকে যেমন এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে অন্যদিকে তেমনি অনিশ্চয়তাও দেখা দিয়েছে। 

দলীয় সূত্র, অবসরপ্রাপ্ত আমলা, নিরাপত্তা খাতের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ‘সমন্বিত পদায়ন পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। যার লক্ষ্যÑ দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে প্রশাসন পুনর্গঠন; পাশাপাশি বিগত সময়ের রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের আস্থা পুনরুদ্ধার। নীতিনির্ধারকরা ভাবছেন যে, দলের প্রশাসনবিষয়ক অভিজ্ঞ সাবেক আমলাদের পরামর্শ ও প্রশাসনিক সংস্কারকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে; মন্ত্রিসভা গঠনে নবীন-প্রবীণ সমন্বয়ের পাশাপাশি সচিব ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও ‘মেধাভিত্তিক’ নির্বাচন নিশ্চিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি ছোট টাস্কফোর্স গঠন করে পদায়ন-নীতিমালা, পদোন্নতির সূচক এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা হতে পারে বলেও জানিয়েছে একাধিক সূত্র। 

সচিব পদোন্নতি ও পদায়নে যোগ্যদের বিশেষ মূল্যায়ন 

সচিবালয়ের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সচিব পদে পদোন্নতি ও পদায়ন। কারণ বিগত সময়ে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পদায়নের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। এমনকি নির্বাচনের আগে অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি ও একাধিক বদলি রাজনৈতিক বিতর্ক উস্কে দেয়। 

সূত্র বলছে, সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট সূচক বাধ্যতামূলক করতে নতুন সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। যেমনÑ কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) বিশ্লেষণ; দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অবদান; ফাইল নিষ্পত্তির গতি ও গুণমান এবং দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক অর্জন এবং দুর্নীতিমুক্ত সুনাম ও শৃঙ্খলা রেকর্ড। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও নতুন করে পর্যালোচনায় আসছে। সংসদ নির্বাচনের পরপরই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের ঘটনাকে প্রশাসনে একটি ‘নীতিগত বার্তা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “প্রশাসনের স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতা পুনর্গঠনের প্রথম শর্ত, স্বচ্ছ মানদণ্ডভিত্তিক পদায়ন। শুধু বদলি করলেই সংস্কার হয় না। কেন বদলি, কী সূচকে পদায়নÑ এসব প্রকাশ্য করতে হবে।” তার মতে, সচিবালয়ে ‘কার্যসম্পাদনভিত্তিক স্কোরিং সিস্টেম’ চালু করা গেলে পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক কমবে।

বিতর্কিত ডিসিরা প্রত্যাহার হতে পারে

নির্বাচনকালে কতিপয় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা নতুন সরকারের সংস্কার-আলোচনায় বড় প্রভাব ফেলেছে। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অভিযোগ ছিল, নির্বাচনকালে কিছু জেলায় মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষ আচরণ করেনি। একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, যেসব জেলায় নির্বাচনের সময় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে, সেসব জেলার ডিসিদের প্রত্যাহার করা হতে পারে। একই সঙ্গে বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়েও রদবদল আসতে পারে।

সাবেক এক সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “মাঠ প্রশাসনে আস্থার ঘাটতি থাকলে সরকারের নীতিও ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয় না। নতুন সরকার চাইলে ন্যূনতম দুই বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদ নিশ্চিত করতে পারে, যাতে ঘন ঘন বদলির সংস্কৃতি কমে।”

এসপি-ওসি নিয়োগে স্বচ্ছতার দাবি

পুলিশ প্রশাসন নিয়ে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে, এসপি ও থানার ওসি নিয়োগে পক্ষপাতের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকারের অধীনে জেলা পর্যায়ে কয়েক দফা রদবদল হতে পারে। নির্বাচনের সময় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল এমন জেলাগুলোতে দ্রুত পরিবর্তন আসতে পারে। বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগে কয়েকজন এসপিকে প্রত্যাহার করা হতে পারে। একই সঙ্গে সিআইডি ও ডিবি ইউনিটে দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাখায়াত হোসেন জানান, “পুলিশিংকে পেশাদার রাখতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কমান্ড স্ট্রাকচার দরকার। বদলি, নিয়োগে নির্দিষ্ট মেয়াদ, স্বচ্ছ প্যানেল ও পারফরম্যান্স অডিট চালু করা যেতে পারে।” মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রস্তাব দিয়েছে, এসপি ও ওসি নিয়োগে ‘ফিটনেস অ্যান্ড ইন্টেগ্রিটি স্কোর’ চালু করা হোক। এতে মামলা নিষ্পত্তির হার, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, শৃঙ্খলাভঙ্গের রেকর্ড ও জনসন্তুষ্টি সূচক বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বিতর্ক ও আস্থার সংকট

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনে ব্যাপক বদলি নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছিল। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, সংসদ নির্বাচনে সুবিধা পেতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। যদিও সরকার তা অস্বীকার করে, তবু বিতর্ক থামেনি। নির্বাচনের আগে ডিসি ও এসপি বদলি নিয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দল প্রকাশ্যে আপত্তি জানায়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের ঘটনা প্রশাসনে এক ধরনের মোড় ঘোরানো সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, “এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়Ñ নীতিগত বার্তা।”

অর্থনীতিবিদ ড. সায়েম আমির ফয়সল বলেন, “প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নীতির ধারাবাহিকতা না থাকলে উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি আসে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনিক পেশাদারত্ব বজায় রাখা অর্থনীতির স্বার্থেও জরুরি।”

সংস্কারের রূপরেখা কীভাবে ফিরবে আস্থা

নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনা হচ্ছে, প্রশাসনিক সংস্কারকে টেকসই করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। যেমনÑ সচিব, ডিসি, এসপি ও ওসি নিয়োগে লিখিত মানদণ্ড ও স্কোরিং সিস্টেম। মাঠ প্রশাসনে ন্যূনতম দুই বছর দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা। স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে বার্ষিক কর্মদক্ষতা পর্যালোচনা। বদলি-পদায়নের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও প্রশাসনিক বাস্তবতার সমন্বয়ই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দলীয় সমর্থকদের চাপ, মাঠপর্যায়ের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং দীর্ঘদিনের প্রথাগত সংস্কৃতিÑ সবকিছুর মাঝেই সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে। সরকারের প্রথম ১০০ দিনই হবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের পদায়ন, বদলি ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দেবেÑ রাষ্ট্রযন্ত্র কি সত্যিই দক্ষ ও যোগ্যদের সমন্বয়ে সাজানো হচ্ছে, নাকি পুরনো চক্র নতুন নামে ফিরে আসছে। বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাদারত্বের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কী ভূমিকা রাখেÑ সেটিই এখন দেখার বিষয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা