নাগরিক সেবার অচলাবস্থা ভাঙা
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৮ এএম
মন্ত্রিসভা গঠনের পর তাই শুরুতেই নাগরিক সেবায় গতি ফেরানোর বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকারকে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দীর্ঘদিন ধরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে দেশের নাগরিক সেবা কাঠামো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সারা দেশে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের অপসারণ করে। জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে আমলাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যারা জনসম্পৃক্ত কাজে ছিলেন বলতে গেলে অনভিজ্ঞ। এতে দেশজুড়ে নাগরিক সেবায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। ভোগান্তি বাড়ে সাধারণ মানুষের। মন্ত্রিসভা গঠনের পর তাই শুরুতেই নাগরিক সেবায় গতি ফেরানোর বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকারকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিত ছিলেনÑ এমন অভিযোগে তাদের অপসারণ করা হয়েছিল। তবে সিদ্ধান্তের কয়েক দিনের মধ্যেই সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার কাউন্সিলরদের বিভিন্ন সংগঠন দাবি জানায়, যেসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ নেই বা যারা ফ্যাসিবাদবিরোধী ছিলেন, তাদের পুনর্বহাল করা হোক। যুক্তি ছিল, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একযোগে অপসারণের ফলে স্থানীয় প্রশাসনে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এসব দাবির প্রতি কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। বরং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার কাঠামো পরিচালনার নীতি অব্যাহত রাখে। ফলে নাগরিক সেবা ধীরগতির ফাঁদে পড়ে। সপ্তাহে দুই দিন ছুটি কাটানো আমলাদের কারণে নাগরিকরা ১৪টি মৌলিক সনদ-জন্মসনদ, নাগরিকত্ব সনদ, ওয়ারিশান সনদ, চারিত্রিক সনদ, প্রত্যয়নপত্র, মৃত্যুসনদ, অবিবাহিত সনদসহ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এসব সনদ সরকারি চাকরির আবেদন, জমির দলিল, উত্তরাধিকার প্রমাণ বা সন্তানদের স্কুল-কলেজে ভর্তিÑ প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট পৌরসভার মেয়র, জেলা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের অপসারণ করে। পরদিন উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যানদেরও অপসারণ করা হয়। এরপর ২৬ সেপ্টেম্বর দেশের ৩২৩টি পৌরসভার কাউন্সিলর এবং ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একযোগে অপসারণ করা হয়। এই ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ছিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর এবং ময়মনসিংহ। এত বিস্তৃত জনপ্রতিনিধিশূন্যতা স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল করে তোলে।
জনপ্রতিনিধিরা কেবল সনদ প্রদানই নয়, এলাকার সালিশ-নিরসন, মশক নিধন, বাজার ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্প পর্যবেক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তালিকা প্রণয়নে সরাসরি যুক্ত থাকেন। বিধবা ও বয়স্ক ভাতার প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করলেও তৃণমূল বাস্তবতার সঙ্গে তাদের দূরত্ব কার্যকারিতা সীমিত করে। ফলে নাগরিক সেবায় ধীরগতি তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে আস্থার সংকট তৈরি হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশে ডা. শাহাদাত হোসেন মেয়র হিসেবে শপথ নিলেও কাউন্সিলরবিহীন কাঠামোতে পূর্ণাঙ্গ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ। এই শপথ অনেকের কাছে কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয় বরং নাগরিক সেবা পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের ইঙ্গিত।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতান্ত্রিক সরকার যখন স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি তৈরি করে, তখন সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশায় সাধারণ মানুষ আশ্বস্ত হয়। সরাসরি জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া নাগরিক সেবার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নাগরিক অধিকারভিত্তিক সংগঠন সেন্টার ফর সিটিজেনস রাইটসের (সিসিআর) মুখপাত্র ইকবাল কবির বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, জনবিচ্ছিন্ন প্রশাসন টেকসই হতে পারে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নাগরিক সেবায় প্রতিফলিত হয়।’
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা ও নগর ব্যবস্থায় স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতিনিধিরা স্থানীয় পর্যায়ে এলাকার সুনির্দিষ্ট সমস্যা, যেমন রাস্তাঘাট বা ড্রেনেজ চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারেন। হকার, ফুটপাত বা খাল দখলের মতো সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা থাকলে দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নতুন দখলদার রোধ করা সহজ হয়, যা নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে।’
বাংলাদেশ পৌর কাউন্সিলর অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটি সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান জাহিদ বলেছেন, নতুন সরকারের কাছে স্থানীয় প্রতিনিধিদের পুনর্বহালের দাবি জানানো হবে। তার ভাষায়, ‘স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়ার ফলে তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের বেআইনিভাবে অপসারণ করেছে। আমরা নতুন সরকারের কাছে আমাদের পুনর্বহালের জোরালো দাবি জানাচ্ছি। আমাদের মেয়াদ রয়েছে এবং এই বিষয়ে আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে। আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই।’
এদিকে যত দ্রুত সম্ভব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং জেলা-উপজেলার নির্বাচন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয়ে প্রথম কার্যদিবসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।