মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২৩ পিএম
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২৪ পিএম
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দিন বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সচিবালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং সচিবদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। ছবি: পিএমও ফেসবুক পেজ
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো সচিবালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং সচিবদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে জনগণকে দেওয়া তার যে নির্বাচনি ইশতেহার ছিল, তা বস্তবায়নে একরকম কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের উন্নয়নমুখী কর্মসূচি দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “নির্বাচনের আগে আমাদের ইশতেহারে দেশ ও জাতির কল্যাণে যেসব অঙ্গীকার করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে প্রশাসনের পেশাদার ও নিরপেক্ষ ভূমিকা অপরিহার্য।”
দায়িত্ব গ্রহণের
পর প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে
শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখান থেকেই তারা সচিবালয়ে আসেন।
সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ
সভা কক্ষে বুধবার বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া প্রধানমন্ত্রী সচিবদের
সহযোগিতা চান এবং দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দেন।
ওই বৈঠকে উপস্থিত
ছিলেন নুতন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ
ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী।
সচিবদের নিয়ে বৈঠকের
আগে বেলা ৩টায় একই স্থানে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্র
জানায়, বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনি ইশতেহারের মূল অঙ্গীকারগুলো স্মরণ করিয়ে
দেন। তিনি বলেন, জনগণ আস্থা রেখে ভোটে জয়ী করেছে; এখন সেই আস্থার প্রতিদান দেওয়ার সময়।
ইশতেহারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি
দমন জোরদার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো অগ্রাধিকার
বিষয়গুলো উল্লেখ আছে।
প্রধানমন্ত্রী সচিবদের
উদ্দেশে বলেন, “নীতিনির্ধারণ সরকারের দায়িত্ব; কিন্তু তার সফল বাস্তবায়ন প্রশাসনের
দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর নির্ভর করে।
“আদর্শ বা ব্যক্তিগত
মত যাই থাকুক, পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে, ফাইল-জট
কমাতে হবে।”
বৈঠকে প্রশাসনের
নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার পরিবর্তনের
সঙ্গে প্রশাসনের মনোভাব বদলানো উচিত নয়।
“রাষ্ট্রের কর্মচারী
হিসেবে আপনাদের দায়িত্ব সংবিধান ও আইন অনুযায়ী কাজ করা” যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
নাম প্রকাশ না করার
শর্তে এক সচিব বলেন, “নতুন সরকারের মূল বার্তা হলো—দক্ষতা
ও জবাবদিহিতা। অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্তহীনতা বরদাস্ত
করা হবে না।”
সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে
জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রী বক্তব্য না দিলেও প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে
বক্তব্য দিতে বলেন।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সালাহউদ্দীন আহমদ বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রম টেকসই করতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল
রাখা জরুরি।
প্রশাসনের বিভিন্ন
শাখার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের
বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ
করতে হবে।
তিনি আইন বিধিবিধান
মেনে সচিবদের নির্ভয়ে কাজ করার অনুরোধ জানান।
সরকারের সব সচিবের
সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সচিবদের বলেছেন জনগণ বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী রায় দিয়েছেন। সুতরাং সংবিধান
ও আইনবিধি অনুযায়ী ওই ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য সচিবেরা আন্তরিক
হবেন।
তিনি বলেন, সবাইকে
বলা হয়েছে- কে কার সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে, সেটি বিচ্যে নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে
সবাইকে যাচাই করা হবে।
সচিবদের সঙ্গে বৈঠক
সম্পর্কে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির
ইশতেহার পছন্দ করে জনগণ দলটির পক্ষে রায় দিয়েছেন। জনগণের প্রত্যাশা যাতে পূরণ হয়, সে
জন্য সচিবদের পেশাদারত্বের সঙ্গে মেধাকে কাজে লাগিয়ে কাজ করলে দেশের জন্য মঙ্গল হবে।
প্রশাসন বিশ্লেষক
ও সাবেক সচিবদের মতে, নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে আমলাতন্ত্রে গতিশীলতা আনা
এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
সিনিয়র সচিব এ এস
এম সালেহ আহমেদ বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ইতিবাচক। তবে বাস্তবে ফল পেতে হলে স্পষ্ট
নীতিমালা, সময়মতো সিদ্ধান্ত এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।”
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের
মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, সমন্বয়ের অভাব এবং দায় এড়ানোর
প্রবণতা বড় সমস্যা। এগুলো কাটাতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ও শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ
নিরীক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক
সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী খুব সংক্ষিপ্ত, কিন্তু দৃঢ় বার্তা দিয়েছেন। তারা বলেন, নতুন
সরকারের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রশাসন ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগোবে। তবে প্রশাসনের
ভেতরে নীরব এক ধরনের সতর্কতা কাজ করছে বলেও জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
এক সিনিয়র সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং মাঠপর্যায়ে
বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। দ্রুততার চাপে যেন মানের অবনতি না হয়।”
সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের প্রথম উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠক প্রশাসনের উদ্দেশে একটি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে—নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ নয়, বরং পেশাদারিত্ব ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর উদ্যোগ। এখন দেখার বিষয়, কথার প্রতিফলন কত দ্রুত ও কতটা দৃশ্যমানভাবে প্রশাসনের কাজে প্রতিফলিত হয়।
নতুন মন্ত্রিসভার
সদস্যদের সঙ্গে প্রথম মতবিনিময় ও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে প্রাথমিকভাবে তিনটি
অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সেগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
মন্ত্রিসভার বৈঠক
শেষে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন নতুন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বলেন, “নিয়মানুযায়ী সরকারের প্রথম দিনে মন্ত্রিসভার বৈঠক করতে হয়। সকল মন্ত্রী উপদেষ্টা
ও প্রতিমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সকলের উদ্দেশ্যে কিছু অনুশাসন দিয়েছেন।
সরকার ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে, যা পরবর্তীতে সকলকে জানানো হবে।
“সরকার তিনটি খাতকে
প্রথম পর্বে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করবে। এর মধ্যে রয়েছে- দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা
ও সরবরাহ ঠিক রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে
(গ্যাস-বিদ্যুৎ) সমস্যা সমাধানে বিশেষ নজর দেওয়া।”
নতুন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “পবিত্র রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা
পরিস্থিতিকে মানুষের সহনীয় রাখা এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাকে অগ্রাধিকার
দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে তারাবিহ ও ইফতারের সময় বিদ্যুৎ যেন স্বাভাবিক থাকে সেটিকে নজরে
রাখতে সরকার সর্বচ্চো গুরুত্ব দিয়েছে।
“এসব বাস্তবায়ন কীভাবে
করা হবে—সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর
কাছে তুলে ধরবেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”