দীপক দেব
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:২০ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য আজ মঙ্গলবার দুটি শপথগ্রহণের আয়োজন করেছে সংসদ সচিবালয়। এর মধ্যে একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অপরটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। সংসদ সচিবালয় থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সংসদ সদস্যদের এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ পড়াবেন। তবে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দলটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের আনুষ্ঠানিকতার সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা সাংবিধানিক বিধানের মধ্য থেকেই সংবিধান সংস্কার করার পক্ষপাতী। বিএনপির অবস্থান নিয়ে সংশয় তৈরি হলেও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১-দলীয় জোট থেকে নির্বাচিত সদস্যরা আজ সংসদ ভবনে আয়োজিত দুটি শপথ অনুষ্ঠানেই অংশ নেবেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
গতকাল নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি জানান, আজ মঙ্গলবার সকালে দুই দফায় শপথ অনুষ্ঠান হবে। প্রথমে সংসদ সদস্যদের শপথ এবং পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বিকালের দিকে অনুষ্ঠিত হবে মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের শপথ। গতকাল জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকেও পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ পাঠের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণ পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া সকালে সংসদ সদস্যদের শপথের পর বিকালে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ হবে। মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি।
তবে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথে অংশ নেবেন কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দলটি মনে করে, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু নেই। বিদ্যমান সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে বিভিন্ন পদের শপথের বিষয়ে বলা আছে। সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বিষয় নেই। এক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার করে তা অন্তর্ভুক্ত করার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ হতে পারে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। এই অবস্থায় বিএনপি থেকে নির্বাচিত ২০৯ জন এবং তাদের মিত্র দলের ৩ জন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না-ও নিতে পারেন। এর ফলে পরিষদ গঠনের বিষয়টি ঝুলে যেতে পারে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ পাঠ করানো সিইসির সাংবিধানিক এখতিয়ার বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ পাঠ কে করাবেন সেটি এখনও নির্ধারিত নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সাংবিধানিক ম্যান্ডেট, কন্সটিটিউশনাল ম্যান্ডেট হচ্ছে দুইটা। একটা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের, আর হচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কন্সটিটিউশনালি এটার দায়িত্বপ্রাপ্ত। সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ইনশাল্লাহ আগামীকাল সকাল ১০টায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাংবিধানিকভাবে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার অ্যাভেইলেবল না থাকলে বা তারা অপারগ হলে বা তাদের মনোনীত প্রতিনিধি যদি না থাকে, সেই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অপশন হচ্ছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাবেন।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সংবিধান সংশোধনীসহ বেশ কিছু বিষয় নির্ধারিত হওয়ার পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ পাঠ করানো করা যাবে। তিনি বলেন, ‘এর বাইরে সংবিধান সংস্কার পরিষদ, এটা যদি কন্সটিটিউশনে ধারণ করা হয় সেই মর্মে অ্যামেন্ডমেন্ট হয় এবং সেই শপথ পরিচালনার জন্য সংবিধানের তৃতীয় তফসিল ফর্ম হয়, কে শপথ পাঠ করাবেন সেটা নির্ধারিত হয়, এতগুলো হয়-এর পরে হলে হতে পারে।’
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে নতুন প্রশ্ন : জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অনুযায়ী সংস্কার আনবেন তারা। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হওয়ার কথা। তবে বিদ্যমান সংবিধানে শুধু সংসদ সদস্যদের শপথের কথা বলা আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা এ ধরনের কিছু না থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তাকে যৌক্তিক হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক অধ্যাপক। নাম প্রকাশ না করা শর্তে গতকাল সন্ধ্যায় তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন থেকে শুরু করে নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত সবকিছুই সংবিধান অনুসরণ করে করা হচ্ছে, সেখানে শুধু সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে সংবিধান মানতে সমস্যা কোথায়? যেখানে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে বলাই আছে, সংবিধান সংস্কার কীভাবে করতে হবে, সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা খুবই যৌক্তিক।’
দুই শপথই নেবেন জামায়াত-এনসিপি ও ১১-দলের এমপিরা : বিএনপির পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ১১-দলীয় জোট থেকে নির্বাচিত এমপিরা দুটি শপথে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানা গেছে। শপথের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গতকাল জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত এমপিরা নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করেছেন। সেখানে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বিজয়ী প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা সংসদে যাব। আমরা সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব।’
অন্যদিকে এনসিপি থেকে নির্বাচিতরাও দুটি শপথগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত। তিনি গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে আলোচনার সময় আমরাই এই প্রস্তাব দিয়েছিলাম। যদিও বিএনপি এটা নিয়ে বিরোধিতা করছে।’ প্রসঙ্গত, গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনাতে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন এনসিপি নেতারা।
নোট অব ডিসেন্ট বিষয়ে অনিশ্চয়তা : সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবনার বেশ কয়েকটি বিষয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি ছিল। ফলে জুলাই সনদের যে সব বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নোট অব ডিসেন্ট নেই, সেসব প্রশ্নে সংস্কারগুলো নিয়ে তেমন কোনো সংকট না থাকলেও নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া বিষয় নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। এরই মধ্যে দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদের উচ্চকক্ষের গঠন নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। কারণ বিএনপি তাদের ইশতেহারে সংসদের আসন সংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করার কথা বলেছে। বিপরীতে গণভোটের প্রশ্নে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষের গঠনের কথা বলা হয়েছে ভোটের আনুপাতিক হারে।
আসন সংখ্যার হিসেবে যদি জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে বিএনপি জোট ১০০টির মধ্যে ৭০টি, জামায়াতে ইসলামী অন্তত ২৬টি এবং এনসিপি ২টি আসন পেতে পারে। বিপরীতে ভোটের আনুপাতিক হারের বিবেচনায় উচ্চকক্ষ গঠন হলে বিএনপি জোটের আসন কমে হবে ৫২ থেকে ৫৩টি, আর জামায়াত জোটের হবে অন্তত ৩৮টি।