মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগ
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৩৯ পিএম
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৫৬ পিএম
রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বোচ্চ আমলাতান্ত্রিক পদ- মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এই পদে নিয়োগ ঘিরে এক দিনের ব্যবধানে একাধিক প্রজ্ঞাপন জারি ও বাতিলের ঘটনাকে জনপ্রশাসনের ইতিহাসে বিরল নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের প্রাক্কালে ও নতুন সরকারের শপথের ঠিক আগমুহূর্তে এমন দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে দিয়েছে নানা প্রশ্নের জন্ম। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রশাসনিক রেওয়াজ, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারাবাহিকতা ও মাঠ প্রশাসনে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিতর্ক- সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন আলোচনায়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নিয়োগের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এসএমএস সিরাজ উদ্দিন মিয়া। তার পদত্যাগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন সোমবার সন্ধ্যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জারি করেছে। এর আগে শনিবার সরকার তাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু সোমবার সেটি বাতিল করা হয়। একই দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব (চুক্তিভিত্তিক) ড. নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব (চুক্তিভিত্তিক) হিসেবে পদায়ন করা হয়।
এরও আগে বিসিএস প্রশাসন ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা ড. শেখ আব্দুর রশিদকে দুই বছরের চুক্তিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় আট মাস আগেই নিয়োগ বাতিল করা হয়। একটি সূত্র বলছে, তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনের ভেতরে আলোচনায় রয়েছে- মাঠ প্রশাসনে ডিসি ও ইউএনও নিয়োগ নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক চাপই এই পদত্যাগ ও পুনর্বিন্যাসের পেছনে কাজ করেছে? সব মিলিয়ে তিনটি প্রজ্ঞাপন- একটি নিয়োগ, একটি অতিরিক্ত দায়িত্ব, একটি বাতিলÑ মাত্র তিন দিনেই এতকিছু হওয়ায় প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে পদায়ন পাওয়া ড. নাসিমুল গনি বিসিএস ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা। ২০০১-০৬ সালের মধ্যে তিনি মন্ত্রী ও স্পিকারের একান্ত সচিব এবং জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছে, এ কারণেই তাকে এ পদে আনা হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ভূমিধস বিজয়ের পর প্রশাসনিক কাঠামোতে পুনর্বিন্যাস হতে পারে- এমনটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জ্যেষ্ঠতার রেওয়াজ ভেঙে এক দশক আগে অবসরে যাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তাকে চুক্তিতে শীর্ষপদে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে যুক্তি ছিলÑ দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতার তালিকা এড়িয়ে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। তবে এই যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রশাসনের শীর্ষপদে নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা একেবারে অনুপস্থিত থাকে- এমন দাবি করা যাবে না। তবে একদিনে প্রজ্ঞাপন জারি ও বাতিলের ঘটনা প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য ভালো বার্তা দেয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রবণতা বাড়লে ক্যারিয়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার স্বীকৃতি না পেলে প্রশাসনে অস্বস্তি তৈরি হয়।’
প্রাপ্ত সূত্রমতে, বাংলাদেশের প্রশাসনিক রেওয়াজ অনুযায়ী, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে থাকা কর্মকর্তা মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন। কিন্তু গত এক দশকে এই রেওয়াজে ব্যত্যয় ঘটেছে একাধিকবার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারা শুরু হয়। এতে অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সেই ধারার অব্যাহত থাকা প্রশাসনে দ্বৈত মানসিকতা তৈরি করেছে। একদিকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন, অন্যদিকে পেশাগত জ্যেষ্ঠতার মর্যাদা- এ দুয়ের টানাপড়েনে সিদ্ধান্তগুলো এসেছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদটি কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সমন্বয়কারী। এখানে স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন পরিবর্তন নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তখনই যুক্তিযুক্ত, যখন তা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেটি যদি নিয়মে পরিণত হয়, তবে প্রশাসনের স্বাভাবিক ক্যারিয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রশাসনের শীর্ষপদে নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা বা সরকারপ্রধানের আস্থার প্রশ্ন একেবারে অনুপস্থিত- এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়। সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রয়োগিত হয়, ফলে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে আস্থার বিষয়টি একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। তবে সেই বাস্তবতার মধ্যেও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক রেওয়াজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক দিনে প্রশাসনের শীর্ষপদে প্রজ্ঞাপন জারি ও বাতিল প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও পূর্বানুমাণযোগ্যতার জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না। জনপ্রশাসন একটি ক্যারিয়ারভিত্তিক কাঠামো। এখানে পদায়ন ও নিয়োগে স্বচ্ছতা, জ্যেষ্ঠতার স্বীকৃতি ও নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মচারী (চাকরি) আইন, ২০১৮ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পদায়ন ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও সেটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থায় হওয়া উচিত। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ যদি নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে ক্যারিয়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি ও দীর্ঘমেয়াদে মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
শপথ অনুষ্ঠান ও প্রতীকী গুরুত্ব : রেওয়াজ অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ সচিবই মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপতি শপথ পড়ালেও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সমন্বয় করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তাই শপথের আগমুহূর্তে এ পদে পরিবর্তন প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। আজ মঙ্গলবার বিকালে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ড. নাসিমুল গনিই শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেনÑ এমনটাই নিশ্চিত রয়েছে।
প্রশাসনের মনোবল ও ভবিষ্যৎ বার্তা : এই ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ মনোবলে। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা যদি দেখেন, শীর্ষপদে চুক্তিভিত্তিক বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বারবার আসছেন, তাহলে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সচিব পদোন্নতি প্রত্যাশী একজন অতিরিক্ত সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তারা যারা ক্যারিয়ার সার্ভিসে আছেন, তাদের জন্য জ্যেষ্ঠতার স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাজনৈতিক বিবেচনাই প্রধান হয়ে ওঠে, তাহলে পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে এক দিনের ব্যবধানে প্রজ্ঞাপন জারি ও বাতিলÑ এটি নিছক প্রশাসনিক রদবদল নয়; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক আস্থা এবং পেশাগত রেওয়াজের এক জটিল সমীকরণ। নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া কখনও কখনও প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু ঘন ঘন পরিবর্তন প্রশাসনের ধারাবাহিকতায় আঘাত হানতে পারে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পদটি কেবল প্রশাসনিক প্রধানের নয়; এটি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী। সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের জন্য দায়বদ্ধতা সমষ্টিগত, আর সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রশাসনিক সমন্বয় করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। ফলে এ পদে ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘন ঘন পরিবর্তন নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্প, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শীর্ষপদে দ্রুত রদবদল সেই স্মৃতির ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলতে পারে।’ তার মতে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ আইনসম্মত হলেও সেটি ব্যতিক্রমী প্রয়োজনেই সীমিত থাকা উচিত। রাজনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সেটি যেন প্রশাসনিক নীতির বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়Ñ সে সতর্কতাই এখন প্রাসঙ্গিক।