আসছে নয়া মন্ত্রিসভা
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৮ এএম
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৫ এএম
ফাইল ফটো
বিএনপি প্রধান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন ঘিরে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ে গতকাল রবিবার অফিস সময়জুড়ে ছিল ব্যাপক তৎপরতা। সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল কোন এলাকার এমপি কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন। অনেকে বলছেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আনুষ্ঠানিক দপ্তর বণ্টনের প্রজ্ঞাপন জারির আগেই এক ধরনের ‘অফিসিয়াল হোমওয়ার্ক’ সেরে ফেলেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা।
অন্যদিকে গতকাল বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসোসিয়েশন-এর (বাসা) নেতারা সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিযোগ তুলেছেন। বলেছেন, বিগত ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি অনুগত হয়ে প্রশাসনে পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রাক্কালে সেই অভিযোগ প্রশাসনিক অন্দরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গতকাল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা সচিবালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সংক্ষিপ্ত সভা, ফুলেল শুভেচ্ছা এবং স্মারক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। তবে একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও ভেতরে ভেতরে সবাই বুঝছেন এখনই শুরু হচ্ছে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অধ্যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নতুন মন্ত্রী এলে প্রথম ১০০ দিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। নীতিগত অগ্রাধিকার, চলমান প্রকল্পের গতি, এমনকি পিএস-এপিএস নিয়োগ সবকিছুতেই দ্রুত সিদ্ধান্ত আসে। তাই প্রস্তুতি না নিলে পিছিয়ে পড়তে হয়।
প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, সম্ভাব্য নতুন মন্ত্রীদের প্রোফাইল, তাদের নির্বাচনী এলাকা, অগ্রাধিকার খাত এবং পূর্ববর্তী বক্তব্য বিশ্লেষণ করে নোট তৈরি করেছেন কয়েকজন সচিব। কেউ কেউ সম্ভাব্য ব্রিফিং ডকুমেন্টও প্রস্তুত রেখেছেন, যেখানে মন্ত্রণালয়ের চলমান বড় প্রকল্প, বাজেটের অবস্থা, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং ঝুলে থাকা নীতিগত সিদ্ধান্তের তালিকাও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মন্ত্রী বদল মানেই নীতি বদল নয়, কিন্তু অগ্রাধিকারের সামান্য পরিবর্তনও প্রশাসনিক গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই প্রস্তুতি জরুরি।
অন্য এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত আগ্রহ কখনও কখনও ভুল বার্তা দেয়। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা রক্ষা করাই প্রথম দায়িত্ব।
আনুগত্যের অভিযোগ : কতটা বাস্তব, কতটা রাজনৈতিক?
নেতাদের অভিযোগে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কয়েকজন কর্মকর্তা একটি নির্দিষ্ট দলের নীতিকে সুবিধা দিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব রেখেছেন। যদিও অভিযুক্তদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবু সচিবালয়ের করিডোরে কানাকানি চলছে।
এক নেতা বলেন, তারা চান জনপ্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকুক। যদি কোনো কর্মকর্তা নিরপেক্ষতার সীমা লঙ্ঘন করে থাকেন, অবশ্যই তার তদন্ত হওয়া উচিত। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, অভিযোগ লিখিত আকারে নেওয়া হয়েছে এবং প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী। কিন্তু দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তা হলে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রী-সচিব সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। তবে সেই আস্থা হতে হবে পেশাদারত্বভিত্তিক, ব্যক্তিনির্ভর নয়। তবে প্রথম ১০০ দিনে যদি মন্ত্রী প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখতে না পারেন, তাহলে উন্নয়ন থমকে যায়।’
সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক মন্তব্য করেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ অডিট হলে অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হবে। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান শুরু হলে তা যেন প্রতিহিংসামূলক না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।’
নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সামনে থাকবে কয়েকটি তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। যেমন চলমান প্রকল্পের গতি রক্ষা। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত। প্রশাসনে আস্থা পুনর্গঠন, বাজেট বাস্তবায়ন ও নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
বাদ পড়ার শঙ্কায় অন্দরের উদ্বেগ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন সরকার গঠনের খবরে কিছু সচিবের মধ্যে বাদ পড়ার শঙ্কাও কাজ করছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে তথা অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ে যাদের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের হয়ে ‘দলীয় ঘনিষ্ঠতা’র অভিযোগ উঠেছে, তারা নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর বদলি বা ওএসডি হওয়ার আশঙ্কা করছেন। তবে নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর তারা এখন খুব সতর্ক। নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন মহলে দেনদরবারও করছেন। পাশাপাশি দাপ্তরিক সতর্কতা হিসেবে ফোনালাপ, নথি আদান-প্রদান সবকিছুতেই সাবধানতা অবলম্বন করছেন বলে জানা গেছে।
আনুগত্যের অভিযোগ, বাদ পড়ার শঙ্কা এবং প্রস্তুতির ব্যস্ততার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত এবং পেশাদার প্রশাসনের পুনর্গঠন। অন্যথায় রাজনৈতিক অস্থিরতার ছায়া প্রশাসনের ভেতর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বদলি প্রশাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যদি তা অভিযোগ যাচাই ছাড়া হয়, তাহলে প্রশাসনের মনোবল ভেঙে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেওয়ার পরপরই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব পদে ব্যাপক রদবদল হতে পারে এমন আভাস মিলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনে স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের ধাক্কা এলে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।