কবির হোসেন
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৩২ এএম
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৪২ এএম
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন লোগো
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই নির্বাচনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে দফায় দফায় বসেছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা। এসব সভার পর বারবার দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছিলেন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর তারই প্রতিফলন ঘটেছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সারা দেশে তেমন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ভোটের দিন এমন কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী দেখে যেমন অনেকে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন আবার কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনকে ঘিরে যে নিরাপত্তা সাজানো হয়েছিল তা খুবই ইতিবাচক। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কোনো সহিংসতা ছাড়া একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেটি বাংলাদেশে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। ভয়, শঙ্কা ও মাঠে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। সেই জায়গাতে কিছু সংঘটিত হতে দেওয়া হয়নি। এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি ইউনিট যার যার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছে। এদের মধ্যে বেশি সক্রিয় ছিল সেনাবাহিনী। অল্প সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনী
ব্যারাকে ফিরে যাবে। ফলে দৈনন্দিন আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কিন্তু পুলিশকেই করতে হবে। নতুন একটি রাজনৈতিক দল যখন একটি নতুন সরকার গঠন করে তখন অনেক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। পুলিশ বাহিনীকে সরকারের সঙ্গে আরও বেশি পেশাগত বোঝাপড়ার পাশাপাশি বাহিনীকে সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। যেটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব পালনে সহজ হবে, নাগরিকদের নিরাপত্তা বাড়বে।
এদিকে গতকাল রবিবার প্রধান উপদেষ্টার তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সর্বশেষ সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, পুলিশ তার আত্মমর্যাদা ফিরে পেয়েছে। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। একই দিন ‘সিএএস দরবার’-এ সেনাবাহিনীর সব পদমর্যাদার সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, সংবিধান ও বেসামরিক প্রশাসনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করে আসছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সেনাবাহিনী স্বাভাবিক নিয়মে ব্যারাকে ফিরে যাবে। তবে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সহায়তা অব্যাহত থাকবে। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সময় সেনা সদস্যদের পেশাদারত্ব, শৃঙ্খলা ও দায়িত্বশীলতার প্রশংসা করে সেনাপ্রধান বলেন, ‘কঠিন ও সংবেদনশীল সময়ে সেনাবাহিনী যে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে, তা দেশের মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করেছে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশজুড়ে নেওয়া হয়েছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা ও বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়। রাস্তায় রাস্তায় চেকপোস্ট-তল্লাশি, মোড়ে মোড়ে সশস্ত্র টহল, আকাশে হেলিকপ্টারের চক্করে সারা দেশেই ছিল গোয়েন্দা নজরদারি। টার্গেট ছিল নাশকতার ছায়া ভেদ করে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা। মাঠে ছিল ৬ বাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্যের সমন্বিত বাহিনী। ৩০০ (একটি স্থগিত) আসনেই লাল-হলুদ-সবুজ ক্যাটাগরিতে চিহ্নিত ৪২ হাজার ৭৬৯টি কেন্দ্র ঘিরে জোরদার করা হয়। ভোটারদের ঘিরে বন্দুকধারী পাহারা, থানাভিত্তিক স্ট্রাইকিং ফোর্স, আর সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কঠোর অবস্থানে ছিল প্রশাসন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই কঠোর অবস্থান চলে গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত সাত দিনের এই ‘সিকিউরিটি উইন্ডোতে’ একযোগে কাজ করছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার-ভিডিপির সদস্যরা। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অধীনে কেন্দ্রের নিরাপত্তা থেকে মোবাইল টহল, সবই চলেছে সমন্বিত কমান্ডে। ভোটের মাঠকে উৎসবমুখর ও ভীতিমুক্ত রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে সেনাবাহিনী।
সূত্র জানায়, নির্বাচনের দিন ভোটের পরিবেশ শান্ত রাখতে সেনানিবাসের কন্ট্রোল সেন্টার থেকে তদারকি করা হয়। এ ছাড়া নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা মাঠে কাজ করেছে। পাশাপাশি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে টহল জোরদার করেছিলেন সেনা সদস্যরা। ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং ভোটের পরে ঢাকাসহ সারা দেশের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে সেনাবাহিনী। ভোটের দিন ওয়াকিটকিতে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোর্স পাঠানো এবং হট্টগোল হওয়ার আগেই সেখান থেকে জনতাকে সরিয়ে দিয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
এ ছাড়া তারা নির্বাচনের আগে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের ভোটকেন্দ্র, যাতায়াতের স্থল, ভোট গণনার স্থান ও সার্বিক চিত্রের তথ্য সংগ্রহ করে আগাম সতর্ক ছিল সেনাবাহিনী। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিদর্শন ও অসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। মতবিনিময়কালে সেনাপ্রধান নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।
আইএসপিআর সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রায় এক লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। পাশাপাশি নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার এবং বিমানবাহিনীর তিন হাজার ৭৩০ সদস্য মোতায়েন ছিল। সারা দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২টি জেলা ও ৪১১ উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোয় ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যাম্প থেকে নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান, চেকপোস্ট স্থাপন ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী মোট ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, দুই লাখ ৯১ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। এ ছাড়া ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে বেসামরিক প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছে। নির্বাচনের দিন সামরিক হেলিকপ্টারে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সরঞ্জাম পরিবহনে সহযোগিতা করেছে সেনাবাহিনী।
এর আগে জুলাই বিপ্লবের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনানিবাস থেকে বের হয়ে মাঠে দায়িত্ব পালন করা শুরু করে সেনাবাহিনী। প্রায় এক বছর ছয় মাস ধরে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করেন সেনা সদস্যরা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যখন সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল, থানাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ এবং পুলিশ যখন নিরাপত্তার অভাবে থানায় যায়নি, ওই সময় ঢাকাসহ সারা দেশে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনের আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনসহ একাধিক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার, কিশোরগ্যাং গ্রেপ্তার, বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা, সড়ক আটকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিক্ষোভ করা লোকজনকে বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরানোসহ বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছে সেনাবাহিনী।