× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

চাই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত দেশ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও দীপক দেব

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩০ এএম

চাই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত দেশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠনের অপেক্ষায় এর আগেও চারবার সরকার গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টিতে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হতে চলেছে।

দীর্ঘ ১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির ওপর মানুষের প্রত্যাশার চাপ দলটির অতি সাম্প্রতিক ভূমিধস জয়ের মতোই ভারী। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের রাশ টেনে ধরা, ভঙ্গুর অর্থনীতির চাকাকে সচল করে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এই বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিরঙ্কুশ বিজয়ের এক ধরনের বিপদও রয়েছে। এক্ষেত্রে মানুষের প্রত্যাশা থাকে বিপুল। দেশে বিনিয়োগের যে প্রচণ্ড খরা চলছে, তার প্রভাব মারাত্মকভাবে পড়ছে জনজীবনে। ইতোমধ্যে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছেন। কর্মসংস্থানহীন তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানাই যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের আয় কমে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগে ভয়াবহ খরা যাচ্ছে। নতুন কোনো কর্মসংস্থান নেই। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ জ্বালানি সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন কোনো শিল্প স্থাপন করতে পারছেন না। গ্যাসের চাপের অভাবে অনেক কল-কারখানায় পূর্ণ মাত্রার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সারা দেশে চাঁদাবাজদের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। যানজটের দুঃসহ যন্ত্রণায় নাকাল রাজধানীবাসী।

এই অবস্থায় নতুন সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের। যেমন পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ধারা শক্তিশালী হয়ে ওঠায় দুর্বৃত্তদের অনেকেই ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে, দল এবং প্রশাসনে শক্তিশালী অবস্থানে থেকে দুর্নীতি-অনিয়ম বা নানা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ধারা সৃষ্টিকারী শ্রেণির বিরুদ্ধে নতুন সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না, ভঙ্গুর অর্থনীতির চাকা দ্রুত সচল করাও সম্ভব হবে না। বিএনপির দেওয়া ইশতেহারে প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার ও রাখার এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ-পদোন্নতির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন ঘটাতে পারলে এক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও ঐকমত্য কমিশনের অন্যতম সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার গতকাল শনিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে প্রয়োজন হচ্ছে, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। এটা করতে না পারলে আমরা বেশি দূর এগোতে পারব না। এজন্য হানাহানি ও দ্বন্দ্ব বন্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গত ১৭-১৮ মাসে বিএনপির বহু কর্মীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন ও দখলদারত্বের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সামনে হয়তো আরও পাওয়া যাবে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দলীয় পরিচয়ে কেউ যেন ছাড় না পায়। আইন যেন সবার জন্য সমান থাকে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।’

এদিকে নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর গতকাল শনিবার দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘আমার বক্তব্য স্পষ্টÑ যেকোনো মূল্যে অবশ্যই শান্তি এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ কিংবা ভিন্নমত যা-ই থাকুক, কোনো অজুহাতে অবশ্যই দুর্বলের ওপরে সবলের আক্রমণ আমরা মেনে নেব না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্ন মতÑ প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান।নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিÑ এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।’

সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দলকে সঠিকভাবে গোছানো এবং দলের মধ্যে কারা চাঁদাবাজ, তাদের সন্ধান করতে হবে। বিএনপি কিন্তু অস্বীকার করতে পারবে না যে, তাদের দলে চাঁদাবাজ নেই। এই সমস্ত লোককে দল থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, প্রশাসনে দলীয়করণের একটা মাত্রা তাদের নির্ধারণ করতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘অর্থনীতির দুরবস্থার কারণে দেশের সাধারণ জনগণ কঠিন সময় পার করছে। তাদের আয়Ñ রোজগার কমে গেছে। তারা স্বস্তি চায়। এজন্য কর্মসংস্থান বাড়াতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে নতুন সরকারকে। তার জন্য চাই বিনিযোগবান্ধব পরিবেশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয়ে দ্রুততার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে।’

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান করতে হবে। নতুন সরকারের প্রথম একশ দিনের কর্মসূচিতে এসব বিষয়ে সমাধানে দিকনিদের্শনা থাকতে হবে।’

প্রসঙ্গত, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গণমাধ্যমে অহরহ প্রশাসনকে দলীয়করণ ও তাদের সহযোগিতায় বড় বড় প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ-সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মারপ্যাঁচে খুব বেশি ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি কারও বিরুদ্ধে। মূলত এসব কারণে জনপ্রশাসন সংস্কারের তাগিদ থেকে কমিশন গঠন করে কাজও করা হয়। যদিও তেমন কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সংস্কার, আমলাতন্ত্রের পেশাদারত্ব, দুর্নীতিমুক্ত ও দলবাজমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের গত দেড় দশকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় বিবেচনা, অনুগত-অননুগত বিভাজন, কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি না পাওয়া কিংবা হঠাৎ পদায়ন বাতিলের মতো অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। এমন বাস্তবতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারে ‘যোগ্যতা’ ও ‘পেশাদারত্ব’ নিছক প্রতীকী আকারে নয়, বরং কার্যকরভাবেই দেখতে চাইছেন অনেক কর্মকর্তা ও জনগণ।

এ বিষয়ে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জনপ্রশাসন সম্পর্কিত ইতিবাচক ঘোষণায় প্রশাসনের সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে আগ্রহ দেখা দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করবে তার নেতৃত্বাধীন সরকার পরিচালনার ওপর। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও পদক্ষেপ যেন লালফিতায় আটকে না যায়, সেটি বিশেষভাবে তদারকি করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে যেন অতীতের মতো দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়ন না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে প্রশাসনে দায়িত্বরতদের নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ ও প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। নতুন সরকার পরিচালনায় বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে কয়েক মাসের কর্মসূচি নেওয়া যেতে পারে। এতে অনেকাংশে সফলতা পাওয়া যাবে। জনপ্রশাসনে সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে।’ উল্লেখ্য, বিএনপির ইশতেহারে জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গঠনের কথা বলা হয়েছে। দক্ষ, মেধাবী ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কার, ই-গভর্ন্যান্স চালু এবং দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার রয়েছে।

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরামের কার্যকরী সভাপতি ও সাবেক সচিব আবদুল খালেক বলেন, ‘গত ১৭ বছরে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়নের মাধ্যমে একটি ‘দলদাস আমলাতন্ত্র’ গড়ে তোলা হয়েছিল। মেধাভিত্তিক প্রশাসন ও কাউকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না করার প্রতিশ্রুতি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে কেউ যেন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়Ñ এই অঙ্গীকারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা করা হবে, তা মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশ হিসেবেই করবে বলে দলটির প্রধান উল্লেখ করেছেন। জনকল্যাণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনের প্রতিশ্রুতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া নিঃসন্দেহে স্বাগতযোগ্য।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা