× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায়

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৩৮ পিএম

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:০০ এএম

শেখ আব্দুর রশীদ বাঁয়ে, এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শেখ আব্দুর রশীদ বাঁয়ে, এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বিদায় নিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ। প্রশাসনের সর্বোচ্চ এই আমলা সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা বিতর্ক, পক্ষপাতিত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে গতকাল শনিবার সরকারি ছুটির দিনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তার নিয়োগ বাতিল সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। একই সঙ্গে আরেক প্রজ্ঞাপনে এম. সিরাজ উদ্দীন মিয়াকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রশাসন মহলে এই সিদ্ধান্তকে অনেকে ‘অপ্রত্যাশিত নয়, বরং অনিবার্য’ বলছেন। বিসিএস (প্রশাসন) ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা ড. শেখ আব্দুর রশিদ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরপরই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। প্রথমে তাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়েই বিতর্কের শুরু 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজে উপাচার্য (ভিসি) ও অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুগত শিক্ষকদের প্রাধান্য দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপিপন্থী শিক্ষক নেতারা প্রকাশ্যে আপত্তি জানালেও তা আমলে নেওয়া হয়নি ।

একজন সাবেক উপাচার্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বড় হয়ে উঠেছিল। এতে শিক্ষা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।’

আরও বিস্তর অভিযোগ

পরবর্তীতে ড শেখ রশিদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর অভিযোগের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। মাঠ প্রশাসনের অভিভাবক হিসেবে তিনি জেলা প্রশাসক (ডিসি), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ইউএনওসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নে একটি বিশেষ দলের অনুগত কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দিয়েছেন, এমন অভিযোগ ওঠে।

বিএনপিসহ একাধিক রাজনৈতিক দল অভিযোগ করলেও তা গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। প্রশাসনের অভ্যন্তরে ক্ষোভও বাড়তে থাকে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসক ও নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদায়নে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আরও তীব্র হয়।

প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক পদায়নে নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যদি পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠে, পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।’

‘লটারি’ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন  

সর্বশেষ নির্বাচনের আগে জেলা প্রশাসক নিয়োগ ও ইউএনও পদায়নে ‘লটারি’ প্রক্রিয়ার কথা বলা হলেও এর নেপথ্যে বিশেষ প্রভাব খাটানো হয়েছেÑ এমন অভিযোগ তোলেন বিএনপিপন্থী একাধিক আমলা। অনেকেই সরাসরি তার সঙ্গে দেখা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলে জানা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক সচিব বলেন, ‘প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসে কেউ যদি রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করেন, তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর।’

প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ 

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে সবসময়ই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে সেই নিয়োগকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা শুধু আইনগত নয়, নৈতিকভাবেও রক্ষা করতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রশাসন ঐতিহ্যগতভাবে রাজনৈতিক চাপের মধ্যে কাজ করে। তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মতো পদে থাকা ব্যক্তির কাছে প্রত্যাশা থাকে, তিনি রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেবেন। যদি উল্টো অভিযোগ ওঠে, তা রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত।’

তার মতে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংস্কৃতি যদি নিরপেক্ষতার বদলে আনুগত্যকে পুরস্কৃত করে, তবে প্রশাসনের পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

সূত্রমতে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. রশিদের অপসারণের বিষয়ে সরকারিভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে প্রশাসন মহলে আলোচনা-ছুটির দিনে প্রজ্ঞাপন জারি করাই ইঙ্গিত দেয়, সিদ্ধান্তটি দ্রুত ও গোপনীয়ভাবে কার্যকর করার প্রয়োজন ছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি সেই নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হতে পারে। ফলে এই অপসারণ একটি ‘বার্তা’ হিসেবেও দেখা হচ্ছেÑ প্রশাসনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বরদাশত করা হবে না।

সামনে কী? 

এখন নজর থাকবে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখ্য সচিব এম. সিরাজ উদ্দীন মিয়ার দিকে। তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসনে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কী পদক্ষেপ নেন, তা গুরুত্বপূর্ণ হবে। মাঠ প্রশাসনে ইতোমধ্যে যেসব পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে কি নাÑ সেটিও আলোচনায়।

সব মিলিয়ে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ড. শেখ আব্দুর রশিদের বিদায় প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘদিনের বিতর্ককে সামনে এনে দিয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিলÑ প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসা ব্যক্তির প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এখন দেখার বিষয়, এই পরিবর্তন প্রশাসনে আস্থা ও নিরপেক্ষতার নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে কি না।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা