ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩২ এএম
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৪১ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধ্স জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচনে এ ধরনের বিজয় দলটির গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আত্মত্যাগের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে সংসদীয় ৩০০ আসনের মধ্যে নির্বাচন হওয়া ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি জোটগত ২১২টি জয়ী হয়েছে। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এককভাবে ৭১ ও জোটগতভাবে ৭৮টি আসন পেয়েছে।
রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের জয়ের পেছনে কাজ করেছে
বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা।
পাশাপাশি যুগোপযোগী নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা ও কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক নিয়ে আগামী
দিনের প্রত্যাশাকে সামনে টেনে আনা।
বিএনপির ভূমিধ্স বিজয় নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের
উপাচার্য ও বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহর মূল্যায়ন, বিএনপির বিজয়ের
প্রথম কারণ হচ্ছেÑ দেশের মানুষ মনে করেছে গত দুই যুগ ধরে বিএনপির প্রতি বেইনসাফি করা
হয়েছে। তাদেরকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। জনগণ এটির প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে।
দ্বিতীয়ত-জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী সম্পৃক্ত ছিল। দলটি জুলাই
গণঅভ্যুত্থান, সংস্কার প্রশ্ন, আগামীর বাংলাদেশ কেমন দেখতে চাই সেই প্রশ্নে সোচ্চার
ছিল। তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল চমৎকার ও বিশ্বসেরাদের একটি। জনগণ এটি গ্রহণ করেছে।
তৃতীয়তÑ বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গত সরকার যেভাবে মৃত্যুর দিকে
ঠেলে দিয়েছিল সেই কষ্টকর পরিস্থিতিটা মানুষের মনে রেখাপাত করেছে। চতুর্থতÑ বিএনপির
বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত ১৯ দিনে দেশের আনাচ-কানাচ ঘুরে মানুষকে মোবিলাইজড
করেছেন। মানুষ মনে করেছে তাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্মের জন্য আরেকজন নেতা খুঁজে পেয়েছে।
তারেক রহমানের বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা জনগণ গ্রহণ করেছে। পঞ্চমÑ জনগণ মনে করেছে এ
দেশের জন্মের বিরোধিতাকারীরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এই নৈতিক ভিত্তি জামায়াতের নেই।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মো. শামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিএনপির
বিজয়ের পেছনে বড় কারণ হচ্ছে নির্বাচনের আগে জনমানুষের যে চিন্তা-চেতনা ছিল বিগত ১৬
বছরে তারা ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার নির্বাচন পায়নি। সেই আকাঙ্ক্ষাবোধ থেকে সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত
হয়েছে বিএনপি। এর নেতৃত্বে ছিল প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর
রহমানের সন্তান তারেক রহমান। তারেক রহমানের নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যে দেখা গেছে তিনি দলটিকে
সুসংহত করে রেখেছিলেন। ১৬ বছরে কোনো ধরনের ভাঙন হয়নি। এই নেতৃত্বগুণ বিএনপির পক্ষে
ভোট আনতে ফলপ্রসূ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে লন্ডন থেকে ফিরে এসেছে তিনি বলেছিলেন, আই
হ্যাভ এ প্ল্যান অর্থাৎ তিনি প্রচারে নতুনত্ব নিয়ে এসেছেন।
জনসভায় বক্তব্যে নতুনত্ব এনেছেন জানিয়ে এই অধ্যাপক বলেন, সাধারণত
জনসভাগুলোতে প্রথাগত যে ধরনের বক্তব্য দেন রাজনীতিবিদরা তিনি তা থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
তিনি উপস্থাপনায় নতুনত্ব নিয়ে এসেছেন। এ ধরনের প্রচার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা
উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়। এতে যুবকরা আকৃষ্ট হয়েছে। কোনো ধরনের সম্ভাষণ না করে মূল
বক্তব্যে চলে যেতেন।
প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক জোটকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেননি উল্লেখ করে এই
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, তারেক রহমান দুয়েক ঘটনা ছাড়া তার প্রতিপক্ষ জোটকে আক্রমণ করে
কোনো কথা বলেননি। তিনি নিজের বক্তব্যগুলো দিয়ে গেছেন। এটি জনগণের মনে রেখাপাত করেছে।
তার প্রতিশ্রুতিগুলো তরুণরা গ্রহণ করেছে। নারীদেরও আকৃষ্ট করায় ধানের শীষে ভোট দিতে
প্রাধান্য দিয়েছে।
চবি (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষক সমাজের (সাদা দল) ভারপ্রাপ্ত
আহ্বায়ক ড. শাহাদাত হোছাইন নির্বাচন নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে
তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের একজন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে বৃহস্পতিবার
চট্টগ্রাম শহরের অনেক ভোটকেন্দ্র এবং অলিগলি ঘুরে বেড়িয়েছি। তাতে দেখা গেছে, ১১ দলীয়
জোট যে সিটগুলো জিতেছে এবং যেগুলো কম ব্যবধানে হেরেছে (৫০০০ বা এর কম) তাতে দেখা যায়
১১ দলীয় জোটের জনসমর্থন নির্বাচন পূর্ববর্তী হাইপেকে ভ্যালিডেইট করে। এর বাইরেও অন্য
আসনগুলোতেও এ জোট অনেক ভোট পেয়েছে। নির্বাচনের সফলতা শুধু জনগণের ভোট দেওয়ার মধ্যে
সীমাবদ্ধ নয়। ভোট গণনা থেকে শুরু করে ফলাফল তৈরি পর্যন্ত যে ধাপ আছে তাতেও দক্ষতা ও
সক্ষমতা দেখাতে হয়। এক্ষেত্রে ১১ দলীয় জোটের দক্ষতা বিএনপির ধারে কাছেও ছিল না। এ ছাড়াও
উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে ভোটের দিন প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে বিএনপির জনশক্তি ১১ দলীয়
জোটের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ছিল।
মানুষের আশ্বাস জন্মেছে বিএনপি মানুষকে গণতন্ত্র নিতে পারবে উল্লেখ
বলে করেছেন পলিটিক্যাল অ্যান্ড পলিসি সায়েন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (পিপিএসআরএফ) চেয়ারম্যান
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান।
তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমতÑ বিএনপি গত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে
যে লড়াই করেছে সেজন্য মানুষের তাদের প্রতি একটি আস্থা তৈরি হয়েছে। মানুষের আশ্বাস জন্মেছে
বিএনপি মানুষকে গণতন্ত্র নিতে পারবে। দ্বিতীয়তÑ বিএনপির বড় প্রতিপক্ষরা দেশে কর্তৃত্ববাদ
ও ফ্যাসিবাদ তৈরি করেছে। সেখানে তারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। এই পার্থক্যটা জনগণ
বুঝেছে। তৃতীয়তÑ বর্তমানে যারা বিএনপি প্রতিপক্ষ (জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট)
তারা দেশের সকল মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এসব কারণে মানুষ বিএনপিকে বড় বিজয়
এনে দিয়েছে।
নির্বাচনের ১৫-২০ দিন আগে জামায়াতের ওপর একটি জোয়ার উঠেছিল এটি তারা
ধরে রাখতে পারেনি কেন জানতে চাইলে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, আমার মনে হয় এটি জোয়ার
নয় বরং তাদের ফেসবুকভিত্তিক আলোচনা। জনতার সঙ্গে এটির কোনো সংযোগ নেই। কালকেও (বৃহস্পতিবার)
প্রথম দিকে ফেসবুকে যে রেজাল্ট দেখেছিলাম সেটি কী হয়েছে? বাস্তবের সঙ্গে তার মিল নেই।
জনপ্রত্যাশা ও ফেসবুক প্রত্যাশা এক না। কেননা ৪-৫ মিলে ফেসবুক কাঁপিয়ে দেওয়া যায়। ফেসবুকের
প্রচারণায় সে ভোট দেয় না। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে দেয়।
বিএনপির সামনের
চ্যালেঞ্জ : বিএনপির সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক
ড. এএসএম আমানুল্লাহ বলেন, বিএনপি যাদেরকে নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিল তাদেরকে সমন্বয়
করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। দ্বিতীয়তÑ জামায়াত এবং এনসিপি বিশেষ করে জামায়াত জোট বিশাল
একটি সংখ্যক সদস্য নিয়ে সংসদে যাচ্ছে, তাদেরকে নিয়ে কীভাবে সমন্বিতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা
করা যায় তা ঠিক করতে হবে। তৃতীয়তÑ জুলাই সনদের সংস্কার ও বিএনপির ৩১ দফায় ঘোষিত সংস্কারের
মধ্যে সমন্বয় করে তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তার পরিকল্পনা সাজানো। চতুর্থতÑ দেশের
অর্থনীতি থেমে আছে, সেটিকে গতিশীল করতে হবে। পঞ্চমতÑ দেশে কয়েক কোটি বেকার রয়েছে। এই
বেকার জনশক্তিকে কীভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, মোদ্দাকথা তাদেরকে মেইনস্ট্রিমে
আনতে হবে। ষষ্ঠতÑ যারা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিএনপির বন্ধু তাদের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব
তৈরি হয়েছে। সেটি কীভাবে আবার পুনর্প্রতিষ্ঠা করা যায় সেটি ঠিক করতে হবে। বিশেষ করে
পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে হবে। সপ্তমতÑ শিক্ষা ক্ষেত্রের সমস্যাগুলো
সমাধান করা এবং অষ্টমত পরিবর্তন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
ইশতেহার বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার উল্লেখ করে অধ্যাপক
ড. মো. শামসুল আলম বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও বিভিন্ন জনসভায় যেসব প্রতিশ্রুতি
দেওয়া হয়েছে তা পরিকল্পনামাফিক একে একে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেগুলো আরও বাস্তবসম্মতভাবে
অগ্রাধিকারভিত্তিতে সাজানো একধরনের চ্যালেঞ্জ।
অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের
প্রতি মানুষের যে প্রত্যাশাটা ছিল তা তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এক্ষেত্রে বিএনপির
প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেসব কাজ করতে পারেননি তা বাস্তবায়নের
প্রত্যাশা বিএনপির ওপর তৈরি হবে। এজন্য শুরু থেকেই পরিকল্পনা নিয়ে বিএনপিকে আগাতে হবে।