সম্পাদকের ডেস্ক থেকে
মারুফ কামাল খান
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:১৫ এএম
মারুফ কামাল খান।
আমি উপদেশ কিংবা পরামর্শের ঝুলি খুলে বসিনি, কখনও বসবও না। বাইরে থেকে অনেক কিছুই মনে হয় এবং অনেক কথাই বলা যায়। কিন্তু যারা রাজনীতি করেন কিংবা সরকারে যান তাদের অবস্থান থেকে বাস্তবতা দেখে, মূল্যায়ন করে নেওয়া সিদ্ধান্ত আলাদা হতে পারে। তাই বিভিন্ন বিষয়ে আমি যে মতামত দিই, তা একমাত্র নির্ভুল এবং এটা না মানলে সব রসাতলে যাবে, তেমনটা মনে করি না। আমার মতামত কেউ গ্রাহ্য আবার কেউ অগ্রাহ্য করতেই পারেন।
অনেক দিন পর বাংলাদেশে নির্বাচন ফিরেছে। খুব ভালো একটা ইলেকশন হয়ে গেল। নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়। তবে নির্বাচন গণতন্ত্রের সূচনাপর্ব। নির্বাচন এড়িয়ে গণতন্ত্রের পথে পা বাড়াবার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচন মানেই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নাগরিক নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়া এবং তার নির্ভুল ফলাফল প্রকাশ করা। সেটা হয়েছে, তবে এ নিয়ে পড়ে থাকা যাবে না। আবেগ-উচ্ছ্বাসে যতিচিহ্ন দিয়ে এখন দ্বিতীয় পর্বে পা ফেলতে হবে। এই পর্বে বিজিত পক্ষ বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকা পালনের প্রস্তুতি নেবে। আর বিজয়ীরা একটি দক্ষ, যোগ্য, পরিচ্ছন্ন, মেধাবী ও উন্নত ভাবমর্যাদার সরকার গড়ে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে দায়িত্ব নেবে।
বিজয়ের পরের ধাপই হচ্ছে দায়িত্ব। যে-কোনো বিজয় যতটা কঠিন, দায়িত্ব তার চেয়েও বেশি কঠিন। সেই কঠিনকে কেবল ভালোবাসলেই চলবে না। কঠিন দায়িত্ব পালনের জন্য অনেক কঠিন হতে হয়। নির্বাচনী বিজয়ের নেতৃত্ব দিয়ে সফল হওয়ার পর তারেক রহমানকে এখন সরকার গঠনে এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় নেতৃত্ব দিতে হবে। তাকে আগামী দিনের অর্থাৎ একুশ শতকের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ অস্থির সময়ের উপযোগী ‘টিম তারেক’ গঠন করতে হবে এবং সেটা এখনই। এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তার পূর্ব পরিকল্পনা ও চিন্তা রয়েছে। আমার মত হচ্ছে, এই টিমের সদস্য বাছাইয়ে তাকে নির্মোহ ও আবেগমুক্ত থাকতে হবে। এক্ষেত্রে নো মার্সি, নো ফেভারÑ একমাত্র বিবেচনা থাকতে হবে দক্ষতা, যোগ্যতা, মেধা ও নৈপুণ্য। বাছাই করা প্রতিটি ব্যক্তি সম্পর্কে পাবলিক পারসেপশন কী, সেটাও পরখ করে নিতে হবে। যার যেখানে থাকার কথা ঠিক তাকে যদি সেই অবস্থানে বসাতে পারেন তাহলেই তারেক রহমান তার সরকারের সাফল্যের ৫০ শতাংশ শুরুতেই নিশ্চিত করে ফেলতে পারবেন। জিয়াউর রহমানের সাফল্যের একটা বড় কারণ ছিল তিনি মেধাবী ও দক্ষ-যোগ্যদের খুঁজে এনে এমনভাবে তার টিম তৈরি করেছিলেন যাকে ‘গ্যালাক্সি অব স্টার্স’ বা তারকার মেলা বলে মনে করা হতো।
তারেক রহমানের সরকারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিসরে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের দিক থেকে আসা নানা চ্যালেঞ্জ, আওয়ামী লীগ-জামায়াত-এনসিপির প্রবল বিরোধিতা এবং মিডিয়ার বৈরিতার মুখে পড়তে হবে। এজন্য রাজনীতিকে প্রখর ও শানিত করা অতি জরুরি প্রয়োজন হয়ে দেখা দেবে। এনজিও কিংবা স্থানীয় সরকারের মতো কেবল উন্নয়ন, দারিদ্র্যমোচন ও কল্যাণমূলক প্রকল্প ও কর্মসূচি দিয়ে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।
আমি যদ্দূর জানি, জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতি হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই রাজনীতি প্রবর্তন করেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাতীয় ঐক্যের পতাকা সমুন্নত রেখেছেন। ফ্যাসিবাদের রাজনীতি ছিল ঘৃণা-বিদ্বেষের রাজনীতি। জাতিকে বিভক্ত করার রাজনীতি। দেশের মানুষকে বিভক্ত রাখলে তাদের অপরাজনীতি করার সুবিধা। তাদের ছিল ডিভাইড অ্যান্ড রুল অপকৌশল। জাতিকে বিভক্ত করে শাসন-শোষণ চালানো। জাতিকে তারা ঘৃণা-বিদ্বেষের বিষে জর্জরিত করে গেছে।
বিভক্ত জাতি উন্নতি করতে পারে না। তাই বিএনপিকেই জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই রাজনীতিতে দল থাকবে, মত থাকবে, আলাদা আদর্শ ও কর্মসূচি থাকবে কিন্তু আমরা একপক্ষ আরেক পক্ষকে দুশমন বানাব না। একে অপরের সমালোচনা করবে কিন্তু দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াবে না। প্রতিটি পক্ষের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে। সবাইকে একদল, একমতে এনে আমরা বাকশাল না-করে বৈচিত্র্যের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে জাতীয় ঐক্য। সে ঐক্য হবে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে।
সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আকাশপাতাল দূরত্বের যে অপসংস্কৃতি ফ্যাসিবাদীরা চালু করে গেছে তাতে শাসকেরা স্বর্গের সুখ-সুবিধা এবং বিরোধী দলকে নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। এর অবসান ঘটিয়ে বিরোধী দলকে মর্যাদা, অধিকার ও প্রাপ্য সুবিধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হবে।
ফ্যাসিবাদী জমানার গুরুতর অপরাধীদের উপযুক্ত সাজা নিশ্চিত করার পর ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশনের মাধ্যমে বাকিদের লঘু শাস্তি এবং অপরাধ স্বীকারের মাধ্যমে ক্ষমা করে মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে জাতীয় ঐক্যসূত্র শক্তিশালী করতে হবে। ফিরিয়ে দিতে হবে তাদের রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক অধিকার।
বাংলাদেশিরা শান্তিপ্রিয় জাতি। আমরা উগ্রতার বিরোধী। আমরা চরমপন্থী নই। আমরা উদার মধ্যপন্থী। উগ্রতা বাংলাদেশের পথ নয়। পবিত্র ধর্মের নামে, কিংবা কোনো আদর্শের নামে উগ্রতা বা চরমপন্থা বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই গণতন্ত্র, মধ্যপন্থা, উদারনৈতিকতা ও মানবতার পতাকায় সকলকে মেলাতে হবে। এটাই হবে তারেক রহমানের তথা বাংলাদেশের পথ।
শুরু থেকেই আগামী সরকারকে যে-কোনো মূল্যে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, শান্তিশৃঙ্খলা এবং জনগণের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি পঙ্গু করে গেছে লুটেরা ফ্যাসিবাদ। উন্নয়নের নামে মেগা প্রকল্প করে লুটপাট করেছে। বিদেশে সম্পদ পাচার করেছে। বৈদেশিক ঋণের দুঃসহ বোঝা জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে গেছে। ঋণ করে ঘি খেয়ে তারা দেশটাকে ফতুর করে গেছে। বিএনপিকে বারবারই অতীত শাসকদের ধ্বংস করে যাওয়া অর্থনীতি গড়তে হয়। শহীদ জিয়াকে গড়তে হয়েছে। দেশনেত্রীকে গড়তে হয়েছে। তারেক রহমানকেও এই ধ্বংসস্তূপে আবার গড়ে তুলতে হবে প্রাণবন্ত অর্থনীতি। কঠোর হাতে বিশৃঙ্খলা দমন করে সর্বস্তরে ও প্রতিটি সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করতে হবে বিএনপি সরকারকে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারসাম্য বজায় রেখে সাবধানে ও সতর্কতায় পথ চলতে হবে বিএনপি সরকারকে। কোনো শক্তি-পরাশক্তির দিকে বা কোনো পক্ষে ঝুঁকে পড়া চলবে না। কাছের ও দূরের সকল দেশের সঙ্গে মিতালি গড়তে হবে এবং বজায় রাখতে হবে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে। অন্য কোনো দেশের ঘরোয়া ব্যাপারে বাংলাদেশ নাক গলাবে না এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কেউ নাক গলালে তা বরদাশত করা যাবে না। বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্নকারী তৎপরতায় ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। একই ভাবে অন্য কোনো দেশ তাদের ভূখণ্ড বাংলাদেশের স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিঘ্নিতকারী তৎপরতায় ব্যবহার করতে দেবে নাÑ সেই প্রত্যাশার বার্তাও সকলের কাছে পৌঁছাতে হবে।
প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারে কোনো কোনো মহল বাংলাদেশবিরোধী যে কার্যকলাপ চালায় আমরা তা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে স্পষ্ট করে বলতে হবে, আমরা যুদ্ধ নয় শান্তি চাই এবং সকল লেনদেন, সমস্যা ও বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি চাই।
আমারা দেখতে চাই, তারেক রহমানের সরকার তারুণ্যের কর্মশক্তি ও প্রবীণের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে দেশ গঠনের উদ্যোগ নেবে এবং নারীকে মূল স্রোতধারায় এনে তাদেরকে সমঅধিকার ও মর্যাদায় অভিষিক্ত করবে। পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে মৈত্রী স্থাপন এবং পিছিয়ে থাকা প্রতিটি জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার বাস্তবসম্মত কর্মসূচি হাতে নেবে।
এ ছাড়া শিক্ষাকে কর্মমুখী ও বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠন এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে গড়ে তুলতে হবে জ্ঞাননির্ভর আলোকিত সমাজ। তরুণ সমাজকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হবে। খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার বিকাশ এবং সারা দেশে পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
দারিদ্র্য মোচনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ ঘোষিত কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং সকলের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা ও আবাসন পর্যায়ক্রমে নিশ্চিত করে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার পথে এগিয়ে যেতে হবে।
একজন নেতা একই সঙ্গে দল ও সরকারের প্রধান থাকতে পারবে নাÑ জুলাই সনদের এই প্রস্তাবসহ অনেক প্রস্তাবে বিএনপি আপত্তি ও ভিন্নমত দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে এই দলে জনগণের ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের অর্থ হচ্ছে বিএনপির আপত্তি ও ভিন্নমত জনগণের অনুমোদন লাভ করেছে। কাজেই দল ও সরকার উভয় নেতৃত্বই তারেক রহমানের হাতে রেখে সুসমন্বিত ও সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে বিএনপিকে। এই যাত্রায় ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।