ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৩০ এএম
আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:২১ এএম
সরকারের শেষ কর্মদিবসে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন
নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ কর্মদিবসে গত মঙ্গলবার মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদনকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্থগিতাদেশ বহাল থাকার পরও ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি)’ কার্যক্রমের আওতায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ২৪৮টি এনজিওকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদনের এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি; বরং প্রতিটি এনজিওর কাছ থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মহিলা ও শিশু বিষয়ক উপদেষ্টার দপ্তর, মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ প্রশাসন ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নির্বাচনকালীন সংবেদনশীল এই সময়ে তড়িঘড়ি করে কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ভিজিডির নাম বদল ও এনজিও নির্ভরতা : অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর এক পরিপত্রে ‘দুস্থ মহিলা উন্নয়ন (ভিজিডি)’ কর্মসূচির নাম পরিবর্তন করে ‘ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি)’ রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২২-২০২৩ অর্থবছর থেকে এই নতুন নামে কার্যক্রম শুরু হয়। পরিপত্রে বলা হয়, ভিডব্লিউবি কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করবে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সার্বিক তত্ত্বাবধানে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা এবং জেলা পর্যায়ে উপ-পরিচালক সমন্বয় ও মনিটরিং করবেন। উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় চুক্তিবদ্ধ এনজিওগুলো সহায়তা দেবে। এ সংক্রান্ত নীতিমালায় অনলাইন আবেদন এবং ৩৩৩ নম্বরে কলের মাধ্যমে আবেদনসহ ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে। অর্থাৎ কার্যক্রমটির কাঠামোতে প্রশাসনিক তদারকি ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া হয়।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভিডব্লিউবি কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সেবা প্রদানকারী এনজিও নির্বাচন করতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়। সূত্র জানায়, সারা দেশ থেকে ৫০০টির বেশি এনজিও আবেদন করে। কার্যক্রমটি ওই বছরের জুলাই থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। তদন্তের পর প্রকল্পটি স্থগিত রাখা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা হলে ইসি ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বরে এক চিঠিতে নির্বাচনী এলাকায় নতুন করে ভিডব্লিউবি, এমসিপিবিসহ এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ না করার নির্দেশ দেয়। উপ সচিব মো. মনির হোসেন স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়, নির্বাচন সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো কার্যক্রম নেওয়া যাবে না; আগে থেকে পরিচালিত কার্যক্রম অব্যাহত থাকতে পারে, কিন্তু নতুন অনুমোদন দেওয়া যাবে না। ইসির এই নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ কর্মদিবসে ২৪৮টি এনজিওকে অনুমোদন দেওয়ার ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে বিস্ময় তৈরি হয়েছে।
এনজিওপ্রতি ৪-৫ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ : অভিযোগ উঠেছে, অনুমোদনের এই প্রক্রিয়ায়ও বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। প্রতিটি এনজিওর কাছ থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। ২৪৮টি এনজিওর ক্ষেত্রে এই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার মধ্যে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘স্থগিত থাকা একটি প্রকল্প শেষ কর্মদিবসে অনুমোদন দেওয়া অস্বাভাবিক। প্রশাসনিক রীতিতে এমন সিদ্ধান্ত সাধারণত নেওয়া হয় না। এখানে চাপ বা প্রভাব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
পারফরম্যান্স রিপোর্টে কঠোরতা, অনুমোদনে শৈথিল্য : ২০১৪ ও ২০২৪ সালের বিভিন্ন দপ্তরীয় চিঠিতে দেখা যায়, এনজিওগুলোর পারফরম্যান্স রিপোর্ট নিয়ে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। ২০২৪ সালের ১৭ এপ্রিল উপ-পরিচালক শারমিন শাহীন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, প্রতি কোয়ার্টারে এনজিও পারফরম্যান্স রিপোর্ট যথাযথভাবে পূরণ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাঠাতে হবে। কোনো কাটাকাটি, ওভাররাইটিং গ্রহণযোগ্য নয়Ñ বিষয়টি ‘অতীব জরুরি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রশ্ন উঠেছে, যে প্রকল্প মাঠপর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগে স্থগিত ছিল, সেখানে নতুন করে এনজিও বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স মূল্যায়ন কতটা গুরুত্ব পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো স্বতন্ত্র যাচাই-বাছাই হয়েছে কি?
একজন সাবেক অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘পারফরম্যান্স রিপোর্ট যদি নিয়মিত ও কঠোরভাবে মূল্যায়ন হতো, তাহলে অনিয়মের অভিযোগ ওঠার আগেই সংশোধন সম্ভব ছিল। শেষ মুহূর্তে এতগুলো এনজিওকে অনুমোদন দেওয়া প্রশাসনিক বিচক্ষণতার পরিচয় দেয় না।’
ইসির নির্দেশনা মানা হয়নি : ইসির ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বরের এক চিঠিতে বলা হয়, নির্বাচনী এলাকায় নতুন ভিডব্লিউবি বা অনুরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালনা করে ইসিকে জানাতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি অনুমোদনটি নতুন কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হয় এবং তা নির্বাচনী এলাকায় প্রযোজ্য হয়, তাহলে এটি ইসির নির্দেশনার পরিপন্থী হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আইনবিদ ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনের সময় সরকারি অর্থে নতুন প্রকল্প অনুমোদন ভোটের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারেÑ এই আশঙ্কা থেকেই ইসি এমন নির্দেশ দেয়। সেটি উপেক্ষা করা হলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আইনি দায় উভয়ই তৈরি হতে পারে।’
জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন : নিয়ম উপেক্ষার এমন ঘটনায় সংগতকারণেই প্রশ্ন উঠেছে, ইসির স্থগিতাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হলো? অনুমোদনের আগে কি আইন বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের মতামত নেওয়া হয়েছিল? ২৪৮টি এনজিও বাছাইয়ের মানদণ্ড কী ছিল? আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের তদন্ত হবে কি? কার বা কাদের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?
এ প্রসঙ্গে গবেষক ডা. আবু তোহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে এনজিও নির্বাচন যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হন। এতে সরকারি অর্থ অপচয় এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি থাকে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বড় অঙ্কের অনুমোদন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারেÑ এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।’
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। প্রয়োজনে দুদক বা স্বতন্ত্র নিরীক্ষা সংস্থার মাধ্যমে অনুসন্ধান হওয়া উচিত।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে শেষ কর্মদিবসে বড় অঙ্কের প্রকল্প অনুমোদন প্রশাসনিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। এতে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে জনসমক্ষে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভিডব্লিউবি কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য অতি দরিদ্র নারীদের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা। নির্বাচনের প্রাক্কালে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত তাই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আইনি কাঠামো ও আর্থিক শৃঙ্খলাÑ তিন ক্ষেত্রেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই অনুমোদন কি নিয়মের ব্যত্যয়, নাকি নিয়মের ফাঁক গলে নেওয়া একটি ‘শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত’? নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহিতাই কেবল পারে এর উত্তর দিতে।