আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:২২ এএম
বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা খুব ভালো নয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী ২০২৪ সাল অর্থাৎ ৫৪ বছরে অনুষ্ঠিত ১২টি নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। সর্বজন গ্রহণযোগ্য তিনটি নির্বাচন বাদ দিলে বাকি নির্বাচনগুলো ছিল প্রহসন, এক তরফা, ষড়যন্ত্র, রাতের ভোট কিংবা আমি-ডামি নির্বাচন। শতকরা হিসেবে মাত্র ২৫ শতাংশ নির্বাচন ছিল গ্রহণযোগ্য। এই বিতর্কিত নির্বাচনগুলো যেমন কোনো সরকারকে গ্রহণযোগ্য করেনি, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে টেকাতেও পারেনি।
স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে। ৫টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়। বাকি দুটি আসনের একটিতে জাসদের সিরাজুল আলম খান, অন্যটিতে জাতীয় লীগের আতাউর রহমান খান বিজয়ী হন। একতরফা নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়লাভের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। পেশিশক্তির ব্যবহার, স্থানীয়ভাবে বিজয়ী ব্যক্তিকে হারিয়ে রেডিও-টেলিভিশনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বিজয়ী দেখানোর ঘটনা ঘটে।
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সামরিক সরকারের অধীনে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ) ২০টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ৮টি, আওয়ামী লীগ (মিজান) ২টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মুজাফফর) ১টি, বাংলাদেশ গণফ্রন্ট ২টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ ২টি, জাতীয় একতা পার্টি ১টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৬টি আসনে জয়লাভ করেন। এ নির্বাচন ঘিরেও ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।
জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পরে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এইচ এম এরশাদ। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি তিনি গঠন করেন জাতীয় পার্টি। ওই বছরের ৭ মে তার অধীনে হয় তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিলেও বিএনপি বয়কট করে। বিজয়ী জাতীয় পার্টি পায় ১৫৩টি আসন। এর বাইরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৭৬, জামায়াতে ইসলামী ১০, জাসদ (রব) ৪, মুসলিম লীগ ৪, ন্যাপ ৫, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ৫, জাসদ (সিরাজ) ৩, ন্যাপ (মুজাফ্ফর) ২, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ ৩, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি ৩ এবং স্বতন্ত্র প্রাথীরা ৩২টি আসনে জয়লাভ করেন। চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও হয় এরশাদের অধীনে। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়া এই নির্বাচনে বিজয়ী জাতীয় পার্টি পায় ২৫১টি আসন। সম্মিলিত বিরোধী দল পায় ১৯টি। অন্যান্য দল ৫ এবং স্বতন্ত্র ২৫ আসন।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরশাদের পতন-পরবর্তী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে। জামায়াতের ১৮টি আসনের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ ৮৮, জাতীয় পার্টি ৩৫, কমিউনিস্ট পার্টি ৫টি এবং বাকশাল ৫টি আসনে জয়লাভ করে। এই সংসদ বাংলাদেশে সংসদীয় ইতিহাসে সবচেয়ে কার্যকর সংসদ হিসেবে পরিগণিত হয়। এই সংসদেই সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে সর্বসম্মতভাবে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়েছিল।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনরত বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। বিতর্কিত এই নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিল পাস করেই সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। সাংবিধানিকভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৫ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৩৫ জন। অংশগ্রহণ করে ৮১টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পায় ১৪৬টি, বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী ৩টি আসন।
সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মোট ভোটার ৭ কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৪। অংশগ্রহণ করে ৫৪টি দল। বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পায় ১৯৩টি আসন। আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি আসন। কোনো নির্বাচনের পর ঝঞ্ঝাটমুক্ত ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা ছিল এটি।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান থাকলেও নিজেদের আস্থাভাজন লোককে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করতে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ করা হয়। বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। সংঘাত-সংঘর্ষে দেশ ভয়াবহ সংকটে পড়ে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠা মিছিলে পিটিয়ে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যার মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ পরিস্থিতিতে সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। যেটি ওয়ান-ইলেভেনের সরকার কিংবা ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দিনের সরকার হিসেবে পরিচিতি পায়।
এক-এগারোর সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থেকে বিরাজনীতিকরণের নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ সময়ে তারা প্রধান দুই নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হয়ে সেনা হেফাজতে নির্যাতিত হন বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অনেক রাজনীতিবিদ। প্রায় দুই বছর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল জয় পায়। এককভাবে আওয়ামী লীগ পায় ২৩০টি আসন। বিএনপি মাত্র ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি আসন। এই নির্বাচনেও ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। বলা হচ্ছিলো, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে একটি দলকে জিতিয়ে দেওয়ার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা হয়।
এক তরফা, রাতের ভোট ও আমি-ডামি নির্বাচন সমাচার : ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত করা হয়। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যে নির্বাচনে ১৫৩ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপিসহ আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচন বর্জন করে। অংশগ্রহণ করে মাত্র ১২টি দল। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ২৩৪টি আসন। জাতীয় পার্টি ৩৪টি আসনে জয়লাভ করে বিরোধী দলের আসনে বসে।
দশম সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও তারা মাত্র ৬টি আসন পায়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এসেছে যে, এই নির্বাচনটি হয়েছে ‘আগের রাতে’। এটি ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। কথিত এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পায় ২৫৮টি এবং জাতীয় পার্টি ২২টি আসন। ৬টি আসন নিয়ে সংসদে থাকলেও শেষ দিকে এসে পদত্যাগ করে বিএনপির এমপিরা।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দল এই ভোট বর্জন করে। অনেক আসনে আওয়ামী লীগের নেতারাই নৌকার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। যে কারণে অনেকে এটিকে ‘আমি-ডামি’র নির্বাচন বলে অভিহিত করেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২৩টি আসনে এবং তাদের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬১টি আসনে জয়লাভ করে। জাতীয় পার্টি ১১টি আসনে, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও কল্যাণ পার্টি একটি করে আসনে জয়লাভ করে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৬ মাসের মধ্যে দেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা এক পর্যায়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অভ্যুত্থানের মুখে ওই বছরের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশের বিগত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে যে, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া কোনো সংসদ যেমন কার্যকর হয়নি তেমনি সরকারও জনবান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর শেখ হাসিনা তিনটি সংসদ নির্বাচন করলেও তা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি এবং শেষ পর্যন্ত তাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়। একইভাবে ১৯৯৬ সালের ১৫ জানুয়ারির এক তরফা নির্বাচন কিংবা নিজেদের পছন্দের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বসানের যে প্রক্রিয়া বিএনপি করেছিল, তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি এবং এক-এগারোর সরকার অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।