প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৪ এএম
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৮ এএম
বিশ্লেষকদের মতে, আগামীকালের নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে আগ্রহ সবচেয়ে বেশি তরুণ সমাজের। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সকল অনিশ্চয়তা-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন ও গণভোট কেন্দ্র করে সারা দেশে দেখা দিয়েছে উৎসবমুখরতা। ভোট উৎসবে অংশ নিতে নিজের এলাকায় পৌঁছানোর জন্য ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন ভোটাররা। বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকায় দীর্ঘ ১৭ বছর পর এবার একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে সারা দেশের মানুষ।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে সম্পন্ন ‘একতরফা’, ‘রাতের ভোট’ ও ‘আমি-ডামি নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যায়িত নির্বাচন তিনটি দেশে-বিদেশে কখনোই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তরুণ ভোটারদের অধিকাংশই সেসব নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার ক্ষেত্র থেকে বঞ্চিত হন। এসব কারণে এবারের নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামীকালের নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে আগ্রহ সবচেয়ে বেশি তরুণ সমাজের। কারণ তরুণদের একটা বিরাট অংশ গত তিন নির্বাচনেই ভোটাধিকার বঞ্চিত থেকেছেন। এই কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চারও হয়েছেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় ঘটেছে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানÑ যেটির মুখ্য ভুমিকায় ছিল দেশের তরুণ সমাজ।
এবার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এদের প্রায় অর্ধেকই তরুণ ভোটার। দেশে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী মোট তরুণ ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৬, যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবেন এরাই।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপর ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা করে এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন।
অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাসের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে চলেছে। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হওয়ার কারণে এবার ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। ভোটগ্রহণ হবে সকাল সাড়ে সাতটা থেকে টানা সাড়ে চারটা পর্যন্ত।
এদিকে নির্বাচন উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন।”
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না– এমন অপপ্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।” নাগরিকদের দলে দলে, সপরিবারে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ‘দ্বিধাহীন চিত্তে’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারপ্রধান।
প্রস্তুতি শেষ করেছে ইসি
গতকাল ঢকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের হলরুমে বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য তথ্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে ‘মিডিয়া সেন্টার’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “শেরপুর-৩ ছাড়া দেশের ২৯৯টি আসনের সবগুলোতে ব্যালট পেপার চলে গেছে, সব নির্বাচন উপকরণ চলে গেছে। ভোটগ্রহণের যে প্রস্তুতি সেটা সম্পন্ন হয়েছে।
“আমরা আগামী ১২ তারিখ সকালে ভোট দিয়ে যুগ-যুগান্তরের একটা সন্ধিক্ষণে আসব এবং দেশে নতুন অধ্যায়ের শুভসূচনা হবে। এই পথ খুব সহজ, মসৃণ ছিল না, অনেক বাধা পেরিয়ে আমাদের এখানে আসতে হয়েছে।’
ভোট গণনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হলে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল প্রথমে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে যাবে। সেখান থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল সংকলন করে কমিশনে পাঠাবেন। কমিশন পর্যায়ক্রমে সেই ফলাফল প্রকাশ করবে।”
ইসি সচিব আরও বলেন, “এবারই প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের কারণে রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তরে আলাদা একটি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পোস্টাল ব্যালট গণনায় কাঠামোগত প্রক্রিয়া ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন থাকায় এসব কেন্দ্রের ফলাফল আসতে তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে, তবে কোনো অবস্থাতেই ফল প্রকাশ অযথা দীর্ঘায়িত হবে না।
“নির্বাচন কমিশন নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্যের ব্যাখ্যাও দেবে।’
অপতথ্য ও অপপ্রচার থেকে সবাইকে বিরত থাকার ও সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সত্য যতই নির্মম কঠিন হোক না কেন, আমরা সেটাই বলব... অসুবিধা নেই তো। সত্য সত্যই।’
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে স্থগিত শেরপুর-৩ আসন বাদে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। তবে জুলাই আন্দোলন দমাতে গণহত্যার অভিযোগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এ ছাড়া তাদের শরিক হিসেবে ১৪ দলীয় জোটের দলগুলোও নেই এই নির্বাচনে। এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন।
এদিকে গত রবিবার থেকে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্যের নির্বাচনি দায়িত্বে থাকার কথা রয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য ১ লাখ ৩ জন। এ ছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০, বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫, পুলিশের ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩, র্যাবের ৯ হাজার ৩৪৯ এবং আনসার ও ভিডিপির ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪৮৩ জন সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এর বাইরে ১ হাজার ৯২২ জন বিএনসিসি ক্যাডেট এবং ৪৫ হাজার ৮২০ জন গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার ও দফাদার) দায়িত্ব পালন করবেন।
এ নির্বাচনে মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সারা দেশে প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬-১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭-১৮ জন পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। আর মেট্রোপলিটন এলাকার সাধারণ ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও আনসারের ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন থাকবেন।
দুর্গম ঘোষিত ২৫ জেলার নির্দিষ্ট এলাকার ভোটকেন্দ্রে ১৬-১৮ জন করে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হবে। এসব সদস্য ভোটগ্রহণের দুই দিন আগ থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট ইসি
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পূর্ববর্তী দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে ইসি। গতকাল বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এই তথ্য জানান।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমানে বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট।”
তবে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন যে, এসব ঘটনা না ঘটলে পরিবেশ আরও সুসংহত হতো। এ সময় তিনি সকল অংশীজনকে নির্বাচনের দিন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান।
নির্বাচন কমিশনার জানান, ভোটগ্রহণের দিন জনস্বার্থে কমিশন চার দফায় ভোটগ্রহণের অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এ ছাড়া বুধবার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিদেশি সাংবাদিকদের সার্বিক পরিস্থিতি জানাতে ব্রিফ করবে কমিশন। অধিকাংশ আসনের ফলাফল নির্বাচনের দিন মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে কমিশন আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন : আগামীকাল অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
তিনি বলেন, সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এবারের নির্বাচনের তিনটি নতুন বৈশিষ্ট্য এটিকে অন্যান্য নির্বাচনের তুলনায় অনন্য করছে। এগুলো হলোÑ সর্বোচ্চসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন, তাদের প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার।