× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এনবিআরের একচ্ছত্র আধিপত্য ভাঙল: আলাদা হলো নীতি ও আদায় বিভাগ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:৪৯ পিএম

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২০:০৬ পিএম

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লোগো। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লোগো। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা ভেঙে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ এবং ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে।

সচিবালয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি’র সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শতাধিক পদ সৃজন, কাঠামোগত বিন্যাস এবং বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদিত হলেও কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই কাঠামোগত সংস্কার।

কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণ, করনীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হাতে ন্যস্ত ছিল। একই কর্তৃপক্ষের হাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা থাকায় স্বার্থের সংঘাত, স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহিতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশে প্রথমবারের মতো নীতিনির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা-এই দুই কার্যক্রমকে সাংগঠনিকভাবে আলাদা করার রূপরেখা দেওয়া হয়।

দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর চূড়ান্ত অনুমোদন

রাজস্ব ব্যবস্থাপনার এই দ্বিখণ্ডন কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়। নথি বলছে, গত বছরের ১৯ নভেম্বর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব আব্দুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। এরপর ২০ জানুয়ারি ২০২৬-এ প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভায় বিষয়টি নীতিগত অনুমোদন পায়। 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মতামত সংগ্রহ করা হয়।

সবশেষে, সচিব কমিটির ১২তম সভায় এসে এই দুই বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন পেল।

একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এটি কেবল নতুন দুটি বিভাগ সৃষ্টি নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনার একটি ঐতিহাসিক সূচনা”।

অ্যালোকেশন অব বিজনেস ও রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬ এ বড় সংশোধন

নতুন দুই বিভাগ গঠন করতে অ্যালোকেশন অব বিজনেস এবং রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬-এ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন ও সংযোজন আনতে হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, জাতীয় সঞ্চয়পত্র সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম অর্থ বিভাগের অধীনে ন্যস্ত করা হচ্ছে।

সরকারের বৈদেশিক ঋণ, সুদের হার ও মুদ্রা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং মুনাফা অর্জন সহ আধুনিক আর্থিক ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহারের এখতিয়ার অর্থ বিভাগ পাচ্ছে।

আর্থিক সম্পদের সিকিউরিটাইজেশন ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কার্যক্রমও যুক্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত নিয়ে ২৪ নভেম্বর ২০২৫ এবং ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দুই দফা আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিবর্তন কার্যকর হলে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর দিকে এগোবে।

শুধু রাজস্ব নয়, সভায় অনুমোদন পেল যেসব বড় সিদ্ধান্ত

সচিব কমিটির ওই সভায় রাজস্ব সংস্কারের পাশাপাশি একযোগে প্রশাসনের প্রায় সব স্তরে বড় আকারের জনবল ও কাঠামোগত সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে রাজস্ব খাতে স্থায়ী ২২টি ক্যাডার পদ ও অস্থায়ী ৩৯টি পদসহ মোট ৬১টি পদ সৃজন।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের জন্য অতিরিক্ত মহাপরিচালকের ২টি স্থায়ী পদ।

মাধ্যমিক শিক্ষা ও কলেজ শিক্ষা আলাদা করে দুটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর গঠনের সিদ্ধান্ত।

বিআরটিএ-তে রাজস্ব খাতে অস্থায়ীভাবে ১১৭টি পদ সৃজন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের শান্তি নিবাসগুলোর জন্য ৮০টি পদ।

সুইজারল্যান্ডের বার্নে নতুন দূতাবাসের জন্য ১০টি পদ।

জাপান সেল ও শ্রম কল্যাণ উইংয়ের জন্য ১৫টি পদ। সবগুলো ক্ষেত্রেই অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ সংশ্লিষ্ট পদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এত বড় সিদ্ধান্ত কেন

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে এসে এত বড় কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা চলছে। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকার সাধারণত নীতিগত বড় সংস্কার নয়, বরং চলমান কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সীমিত থাকে-এটাই প্রচলিত ধারণা। 

তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, “এই অধ্যাদেশ আগেই জারি হয়েছে। কাঠামো অনুমোদন না হলে অধ্যাদেশ কার্যত অকার্যকর থাকত। তাই এটাকে শেষ সময়ের সিদ্ধান্ত বলা ঠিক হবে না”।

অন্যদিকে, সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ আসবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ে। কাঠামো অনুমোদন এক জিনিস, বাস্তবে ক্ষমতা হস্তান্তর আরেক জিনিস”।

রাজস্ব নীতি বনাম রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কার হাতে কী ক্ষমতা

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজস্ব নীতি বিভাগ দায়িত্ব পাবে করনীতি, শুল্কনীতি, কর ছাড়, রাজস্ব কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ দেখবে কর আদায়, প্রশাসন, বাস্তবায়ন, অডিট ও মনিটরিং।

এতে করে নীতি প্রণয়নকারী বিভাগ সরাসরি আদায় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবে না-যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বচ্ছতার একটি স্বীকৃত মডেল।

প্রশাসনিক কাঠামো অনুমোদনের পর পরবর্তী ধাপ হবে জনবল নিয়োগ ও পদায়ন কার্যতালিকা চূড়ান্তকরণ

এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বিদ্যমান ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস

সব মিলিয়ে এটি কেবল আরেকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বাংলাদেশের রাজস্ব শাসনব্যবস্থার দিক পরিবর্তনের একটি পরীক্ষামূলক মুহূর্ত।

এই সংস্কার কতটা কার্যকর হবে— তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আমলাতান্ত্রিক সহযোগিতা এবং বাস্তব প্রয়োগের ওপর। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ লগ্নে এসে এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক শাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে গেল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা