ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:২৬ এএম
আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:২৮ এএম
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সোমবার উপদেষ্টা ও সচিবদের সঙ্গে শেষ বৈঠক করছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: পিআইডি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুদিন আগে উপদেষ্টা ও সচিবদের সঙ্গে শেষ বৈঠক করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সোয়া ১০টায় প্রথমে সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পরে অনুষ্ঠিত হয় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক। সচিবদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকে প্রায় ৭০ জন সচিব উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র বলছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কেবল জরুরি প্রয়োজনেই কোনো বৈঠক হতে পারে। অন্যথায় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর উপদেষ্টা ও সচিবদের সঙ্গে এটিই ছিল শেষ সভা। আর মাত্র কয়েক দিন পরই বিদায় নিচ্ছে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দেড় বছরের এই শাসনামল শেষ হচ্ছে আলোচনা, সমালোচনা, প্রত্যাশা-প্রাপ্তির ফারাক এবং একাধিক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ভার নিয়ে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে টানা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনীতি, প্রশাসনিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়া এই সরকারের কাছে জনসাধারণের প্রত্যাশা ছিল অনেক। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেড় বছরের শাসনামলে সেই প্রত্যাশার কতটা পূরণ হয়েছে তা নিয়ে রয়েছে বিস্তর বিতর্ক।
সরকারি সূত্রে বলা হচ্ছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্যোগ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং টাকার পতন রোধের চেষ্টা ছিল এই সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও কিছুটা অগ্রগতি দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথাই বলছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। আগের দুই মাসেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। আট মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরেই আটকে রয়েছে, যা মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, নারী নির্যাতন ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। বিনিয়োগ বাড়েনি, নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি প্রত্যাশিত হারে।
অন্যদিকে প্রশাসনিক পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকার একটি বড় সিদ্ধান্ত নেয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঞ্চিত ৭৬৪ জন সাবেক কর্মকর্তাকে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে ‘ভূতাপেক্ষ’ পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। সরকার এটিকে প্রশাসনিক ন্যায়বিচার হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সমালোচকরা বলছেন এতে প্রশাসনে নতুন করে বিভাজন তৈরি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সচিবালয়ে এখন স্পষ্টতই বিদায়ের সুর। উপদেষ্টারা নিজ নিজ দপ্তরের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। বেশিরভাগ উপদেষ্টা ইতোমধ্যে তাদের কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। কেউ কেউ নতুন সবুজ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন, কেউ কেউ তা হাতে পেয়েও গেছেন। সরকারি বাসা ছাড়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গত ৩১ জানুয়ারি সরকারি বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার কোনো সরকারি বাসা নেননি, তবে পাসপোর্ট ও সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সরকারি বাড়ি কিংবা কূটনৈতিক পাসপোর্ট কোনোটিই নেননি।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের প্রাক্কালে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী। দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সব উপদেষ্টার সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করা হবে। কিন্তু মেয়াদ শেষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও তা প্রকাশ করা হয়নি। যদিও প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, এক-দুই দিনের মধ্যেই এসব বিবরণী প্রকাশ করা হবে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনের নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ ছিল। কিন্তু সময়মতো সম্পদের বিবরণী প্রকাশ না করায় সেই সুযোগ নষ্ট হয়েছে।
এরই মধ্যে নতুন সরকারের প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য ৬৫ থেকে ৭০টি গাড়ি প্রস্তুত রেখেছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয় সংসদ সদস্যদের শপথের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠিত হবে।
দেড় বছরের শাসনামল শেষে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে। কেউ একে বলছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সরকার, কেউ বলছেন-প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ এক অধ্যায়। ইতিহাসই ঠিক করবে, এই সরকারের অর্জন আর ব্যর্থতার প্রকৃত হিসাব।