ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:২৮ এএম
কৃষি প্রধান দেশের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে; তবে তা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য সেটি বড় হয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে। ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দলগুলো ইশতেহার ঘোষণা করছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন দল নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। তাদের ইশতেহারে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত নিয়ে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য বড় হয়ে উঠেছে সে প্রশ্নটিই।
এসব ইশতেহার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ইশতেহারে প্রায় সব সমস্যায় উঠে এসেছে। তবে এগুলো মৌলিক নয় বরং ভাসা-ভাসা। কৃষিকে লাভ ও সম্মানজনক না করতে পারলে এ খাতের উন্নয়ন হবে না। ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে গঠন করতে হবে মূল্য কমিশন।
গত শুক্রবার ৯টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে ৫১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে ২ নম্বরে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত নিয়ে বলা হয়েছেÑ কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এই ইশতেহারে কৃষক কার্ডের বিষয়টি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মূলত বিগত ২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে কৃষকদের বিনামূল্যে নানা প্রকারের বীজ দিয়ে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাজ করেছিলেন তিনি। তার ঘোষিত ইশতেহারে কৃষির বিভিন্ন বিষয় উঠে আসায় পর্যবেক্ষকরা আশার আলো দেখতে পেয়েছেন।
৪ জানুয়ারি ২৬টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে ৪১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে ৮ নম্বর দফায় বলা হয়েছে প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা। ১৩ নম্বর দফায় কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা হবে। ১৪ নম্বর দফায় ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের ইশতেহারে কৃষিবিষয়ক প্রতিশ্রুতিগুলো তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। কেননা জামায়াতে ইসলামী মূলত ব্যাংক, বীমা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালভিত্তিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়েছে। কৃষি নিয়ে তাদের কার্যক্রম সীমিত। যদিও ২০০১-০৬ সালের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দলটির আমির মওলানা মতিউর রহমান নিজামী প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
৩০ জানুয়ারি ৩৬ দফা নির্বাচনি ইশতেহার দেয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সেখানে ৩২ নম্বর দফায় জানানো হয়েছে, এনআইডিভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি ক্যাশ ব্যাকের মাধ্যমে সার, বীজ ও যন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় কেন্দ্র, মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ ও ওয়্যারহাউস স্থাপন করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য ক্রয় নিশ্চিত করা হবে। ৩৩ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, দেশীয় বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা বৃদ্ধ করে শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হবে। খাদ্য ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
শুক্রবার ছয়টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে ২২ দফা ইশতেহার দিয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক। সেখানে কৃষিপণ্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সহজতর করা হবে, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম ৪ ফেব্রুয়ারি ৩০ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন। সেখানে ৩০ দফা মৌলিক ইশতেহারের ৫ নম্বর দফায় কৃষি ও শিল্পবিপ্লব ঘটিয়ে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যমুক্ত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশ গঠনের কথা বলা হয়েছে।
এসব ইশতেহার নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে কৃষি খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলোই উঠে এসেছে। কৃষক কার্ডের বিষয়কটিকে প্রাধান্য দেব। কেননা আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যাপারে কথা বলে আসছি। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের কাছে তার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পৌঁছানো সম্ভব।
তিনি বলেন, মার্কেট চেইন শক্ত করা, প্রযুক্তিকে উন্নত করার বিষয়ে দলগুলো উল্লেখ করেছে। এখন যে দলই সরকার গঠন করুক; তারা যদি চায় কৃষির প্রকৃত উন্নয়ন করব, তাহলে ইশতেহারের বিষয়গুলো প্রাধান্য দেবে। বিগত সময়ে আমরা দেখেছি ইশতেহারে ঘোষিত বিষয়গুলো পরবর্তীতে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। তবে এবার থেকে তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দরকার, যাতে বাংলাদেশের কৃষি খাত অগ্রসর হয়।
এ প্রসঙ্গে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে কৃষি নিয়ে তাদের কমিটমেন্ট ব্যক্ত করেছে। এসব ইশতেহারে কৃষির মৌলিক সমস্যাগুলো উঠে আসেনি। দ্বিতীয়ত, এগুলো খুবই খণ্ডিতভাবে ও সমস্যাগুলো ভাসা-ভাসাভাবে উঠে এসেছে। দৃষ্টিভঙ্গিতে দিকনির্দেশনা নেই। এ খাতে বড় সমস্যা হচ্ছে- কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) পূরণ করতে হলে এখন যে গ্রোথ আছে, তার প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। অর্থাৎ প্রতি বছরে উৎপাদন ৪ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে। কেননা ২০৩০ সাল পর্যন্ত এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছেÑ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন করা। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্রোথ ছিল ১.৭৯ শতাংশ। স্বাধীনতা থেকে গত ৫৪ বছরে গ্রোথের হার ছিল ৩ শতাংশ করে।
কৃষিকে লাভজনক করতে রাজনীতিবিদদের ঘাটতি কী প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের আমদানি-নির্ভরতা বাড়ছে। খাদ্যশস্যসহ অন্যান্য ফসলেও একই অবস্থা। কৃষি খাতে আমদানি প্রতিস্থাপন নীতি গ্রহণ করতে হবে, এটি কোনো ইশতেহারে উঠে আসেনি। দেশে বছরে গড়ে দশমিক ২ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। উর্বরতা হারাচ্ছে অধিকাংশ জমি। এই বাস্তবতা সামনে রেখে কৃষিনীতি ঠিক করতে হবে। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। মোট বাজেটের ১০ শতাংশ ও ভর্তুকি খাতে ৫ শতাংশ রাখতে হবে। চাষাবাদের নিবিড়তা বাড়াতে হবে।
মূল্য
কমিশন গঠন করা দরকার উল্লেখ করে ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি কৃষকের
কাছ থেকে পণ্য কেনার কথা বলছে। তবে কত শতাংশ কিনবে তা বলছে না। আমার প্রস্তাব উৎপাদনের
কমপক্ষে ১০ শতাংশ সরকারিভাবে কিনতে হবে। এখন শুধু ধান, চাল ও গম কেনা হয়। অথচ আমাদের
মসলা, ডাল, তেল ও সবজিসহ প্রায় ২০ ধরনের পণ্য সরকারকে কৃষকের কাছ থেকে কিনতে হবে। ন্যায্যমূল্য
নিশ্চিতে মূল্য কমিশন করতে হবে। বর্তমানে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ের ১০ শতাংশও লাভ দেওয়া
হয় না। অথচ এটি কমপক্ষে ২৫ শতাংশ দিতে হবে।