দীপক দেব
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৫৮ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার টানতে দলগুলো দিচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা। দেশের বড় বড় বিভাগীয় শহরে নির্বাচনি জনসভা থেকে শুরু করে জেলা শহরগুলোতেও সভা-সমাবেশ, পথসভায় অংশ নিচ্ছেন দলের শীর্ষ নেতারা। নিজ দলের প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে ভোটারের সামনে তুলে ধরছেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। সামগ্রিক ভোটারদের পাশাপাশি তরুণ ও নারীদের আকৃষ্ট করেও দেওয়া হচ্ছে প্রতিশ্রুতি।
ওয়াদা করা হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে। এ ছাড়া প্রথা অনুযায়ী নানা প্রতিশ্রুতি সংবলিত নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে ছোটবড় দলগুলো।
অনেকেই বলেছেন- এবারের নির্বাচনি ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলো নতুনত্ব এনেছে। তাদের মুখে প্রতিশ্রুতির তুবড়ি ছুটলেও রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো উন্নয়নের গৎবাঁধা জায়গা থেকে তারা বেরিয়ে এসেছে। নজর দিয়েছে সামাজিক উন্নয়নের দিকেও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তরুণদের নেতৃত্বে
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনীতি তথা নির্বাচন নিয়ে তরুণ ভোটারদের আগ্রহ অনেক বেশি। এর
সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারী ভোটার; যারা মূল ভোটারের প্রায় অর্ধেক। যে দল বা প্রার্থী এই
দুই অংশের ভোট নিজের পক্ষে রাখতে পারবে বিজয় তাদের জন্য সহজ হবে। এজন্য এবারের নির্বাচনে
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিÑ এনসিপিসহ অধিকাংশ দল দেশ নিয়ে সামগ্রিক
পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির কথা বলার পাশাপাশি নারী ও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্টে অধিক গুরুত্ব
দিচ্ছে। এ ছাড়া রাজনীতিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটারদের নিজেদের পক্ষে আনতেও প্রার্থীদের
পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি আসছে। মূলত বিজয় নিশ্চিত করতে টার্গেট ভোটারদের নিজেদের পক্ষে
আনতেই দেওয়া হচ্ছে এসব প্রতিশ্রুতি।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি সবার
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি অনিয়ম নিয়ে বেশ সোচ্চার ছিল
দেশের তরুণ সমাজ। জুলাই অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পেছনে এই বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছিল এমন
ধারণা থেকেই দলগুলো এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। গত শুক্রবার বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন
দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ৫১ দফা ইশতেহারে বলা হয়েছেÑ বিএনপি
সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহির বিষয়ে
সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। এ ছাড়া বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনি জনসভাগুলোতেও একই ধরনের অঙ্গীকার
করছে দল।
অন্যদিকে ২৬
বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে এর আগেই ইশতেহার ঘোষণা করেছে জামায়াতে
ইসলামী। ২৬ অগ্রাধিকারের মধ্যে দলটি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে
গুরুত্বের সঙ্গে। দলটি বলেছেÑ দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাস্তবায়ন করা হবে
কঠোর ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি। এছাড়া নির্বাচনি জনসভায় দলটির আমির
ডা. শফিকুর রহমান প্রতিনিয়ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন।
গতকাল শনিবার বিকালে সিলেট নগরীর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভায় প্রধান
অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে
জামায়াতে ইসলামী ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সরব অভ্যুত্থানের
নেতাদের হাতে গড়া তরুণদের দল এনসিপি। দলটির নেতারা চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে
নিজেদের কঠোর অবস্থানের কথা প্রতিনিয়ত তুলে ধরছেন।
তরুণ ও নারীদের টার্গেট
জয়-পরাজয়ে
বড় ভূমিকা রাখবে তিন শ্রেণির ভোটার। তরুণ, নারী ও রাজনীতি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে
১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী মোট তরুণ ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটি ৫৬ লাখ
৫৩ হাজার ১৭৬ জন,
যা মোট ভোটারের ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ ছাড়া
নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২Ñ যা মূল ভোটারের
প্রায় অর্ধেক। এই ভোটারদের টার্গেট করে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল তাদের
প্রচারণা চালাচ্ছে।
গত শুক্রবার বিএনপি পক্ষ থেকে ঘোষিত
ইশতেহারে নারী ও তরুণদের আকৃষ্ট করতে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দলটি প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের
প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি
ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন,
স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক
ই-কমার্স প্লাটফর্মে যুক্তকরণ ও মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার কথা
উল্লেখ করেছে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও নারী
ও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা
বেকার-ভাতা নয়,
যুবকদের হাতে কাজ তুলে দেব।’ এ ছাড়া দলটির ২৬ দফা ইশতেহারের
তিন ও চার নম্বর ধারাতেই তরুণ ও নারীদের নিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ৩ নম্বর দফায়Ñ যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র
পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। এ ছাড়া ৪ নম্বর দফায় বলা হয়েছে- নারীদের জন্য নিরাপদ,
মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন করা হবে। এছাড়া এনসিপি
তাদের ইশতেহার ও নির্বাচনি প্রচারে নারী ও তরুণদের কল্যাণে কী করবে তা গুরুত্ব দিয়ে
তুলে ধরেছে।
নৌকার ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা
রাজনীতি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটাররা এবারের নির্বাচনে
বড় ভূমিকা রাখবে। এজন্য আওয়ামী লীগের এই ভোটব্যাংক নিজেদের পক্ষে আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অধিকাংশ দল। নিরাপত্তার নিশ্চয়তাসহ মামলা থেকে অব্যাহতি
পাইয়ে দেওয়ার মতো প্রতিশ্রুতি দিতেও দেখা গেছে আওয়ামী লীগের ভোট পেতে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক
জাহানের বলেন, ‘নৌকার সমর্থক ভোটারদের ভোট কিছু কিছু আসনে
জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তার মূল্যায়ন নৌকার সঙ্গে প্রবাসী ভোট
ক্ষেত্রবিশেষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদি বিশ হাজার ভোটের
মারফতে সিট এদিক-সেদিক হতে পারে সেক্ষেত্রে প্রবাসী ভোট একটা ভূমিকা রাখতে পারে।
সেরকমভাবে আমি বলব আওয়ামী লীগের যে সাপোর্ট আছে ট্রেডিশনাল আওয়ামী লীগ সাপোর্ট
সেগুলো কোনো কোনো আসনে ওই ভোটগুলো মার্জিনÑ এই যে টেন পার্সেন্ট অ্যাডিশনাল ভোট
যদি পড়ে সেটাই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে।’
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ
সংস্থা ফেমা’র প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তরুণ
ও নতুন ভোটারদের মধ্যে ভোট নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহ দেখা গেছে। তবে এবার তারা মার্কা,
প্রার্থী বা দল দেখে ভোট দেবেÑ এমনটা মনে হচ্ছে না। এ ছাড়া শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, এর
বাস্তবায়ন নিয়েও সুনির্দিষ্ট বার্তা চাচ্ছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য খুবই ভালো দিক। অন্যদিকে
নারী ভোটারদের বিষয়টি নিয়ে শুরুতে এত বেশি আগ্রহ না থাকলেও নেতৃত্ব ও কর্মঘণ্টা নিয়ে
জামায়াত আমিরের বক্তব্যের পর এটাকে কাউন্টার দিতেই অন্য দলগুলো নারীদের নিয়ে বেশি গুরুত্ব
দিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে।’
প্রচারে এসেছে নতুনত্ব
এবারের
নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো উন্নয়নের গৎবাঁধা ধারা
থেকে বেরিয়ে সামাজিক উন্নয়নের দিকে নজর দিয়েছে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি)। গতকাল শনিবার সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, এবারের
নির্বাচনি ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলো নতুনত্ব এনেছে। রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো
উন্নয়নের গৎবাঁধা প্রতিশ্রুতি থেকে তারা বেরিয়ে এসেছে এবং সামাজিক উন্নয়নের দিকে
নজর দিয়েছে। তবে তা এখনও যথেষ্ট নয়।
দলগুলোর ঘোষিত প্রতিশ্রুতি তুলে
ধরে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে
সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহার ঘোষণা করেছে। বিএনপি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক
কার্ড, পরিবেশ সুরক্ষায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন এবং পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দলটি আধুনিক বর্জ্য
ব্যবস্থাপনা চালুর কথাও জানিয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ
বছরে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সরবরাহের লক্ষ্য ঘোষণা
করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সরকারি দপ্তরের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন
এবং সরকারি গাড়ির ৪০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরের ঘোষণাও দিয়েছে দলটি।
শিল্প-কারখানায় ইটিপি
প্লান্ট স্থাপন বাধ্যতামূলক করা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার কথা বলেছে
জামায়াতে ইসলামী। দলটি শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং মেয়েদের
উচ্চশিক্ষা বিনা খরচে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। অন্যদিকে কুইক
রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।