অ্যাপ আছে, গাড়ি নেই
কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:২৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর ব্যস্ত সময়। মোবাইল ফোনে একের পর এক ‘নক’ দেওয়া হচ্ছে উবার অ্যাপে। কিন্তু মিনিট পেরিয়ে গেলেও কোনো গাড়ির সাড়া নেই। অবশেষে বাধ্য হয়ে পরিচিত চালকের নম্বরে ফোন ‘ভাই, অ্যাপ বাদ দেন, কন্ট্রাক্টেই আসেন।’ এ দৃশ্য রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। একসময় জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম উবার এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে এমন অভিযোগ যাত্রীদের। অ্যাপ চালু থাকলেও বাস্তবে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে যাত্রীরা বাধ্য হচ্ছেন অ্যাপের বাইরে ‘কন্ট্রাক্ট’ রাইডে যেতে, যা তৈরি করছে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণহীনতার বড় ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে,
যাত্রী নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার, অ্যাপভিত্তিক যাতায়াত
বাধ্যতামূলক করা এবং চালক-যাত্রী উভয়ের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। আইনের কঠোর
প্রয়োগ ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারই পারে রাইড শেয়ারিংসহ সামগ্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থায়
শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।
আজিজুর রহমান
পল্টনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে একটি রাইড শেয়ারিং বাইকে ওঠেন। অ্যাপে
গন্তব্য দেখানোর পর ভাড়া নির্ধারিত হয় ৫০০ টাকা। তবে অ্যাপে দেখানো সড়ক ব্যবহার না
করে চালক অন্য একটি বিকল্প সড়ক দিয়ে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছলে ভাড়া কমে দাঁড়ায় ৩০০ টাকায়।
এ নিয়ে যাত্রী ও চালকের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। চালক ৫০০ টাকা দাবি করলেও যাত্রী
স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অ্যাপে যে ভাড়া দেখাবে, সেটাই তিনি পরিশোধ করবেন। এমন পরিস্থিতিতে
রাইড শেয়ারিং সেবায় যাত্রী ও চালকের মধ্যে প্রায়ই বিরোধের সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে রাজধানীর
যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রকিবুল ইসলাম জানান, তিনি নিয়মিত
যাত্রী পরিবহন করলেও অ্যাপের মাধ্যমে নয়, সরাসরি ‘কন্ট্রাক্টে’ রাইড দেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অ্যাপে অতিরিক্ত
কমিশন কাটা হয়। এতে তেল খরচ ও বাইকের কিস্তি দেওয়ার পর হাতে তেমন টাকা থাকে না। অন্য
এক রাইডার হাসিবুর রহমান বলেন, অনেক সময় অ্যাপ কর্তৃপক্ষ পেমেন্ট আটকে রাখে। যাত্রী
রাইড বাতিল করলে সাপোর্ট থেকেও যথাযথ সহযোগিতা পাওয়া যায় না। তিনি দাবি করেন, সারা
দিনে কন্ট্রাক্টে যে আয় হয়, তা অ্যাপের
মাধ্যমে রাইডের তুলনায় অনেক বেশি।
গত বছরের মে মাসে
রাইড শেয়ারিং চালকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক
মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সুপারিশ করেছে শ্রম সংস্কার কমিশন। প্রতিবেদনে শ্রম অধিকার,
ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ডেটাবেজ সংরক্ষণ ও সার্বক্ষণিক কল সেন্টার চালুরও
সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানায়, বর্তমানে দেশে দেশি
ও আন্তর্জাতিক মিলে ১৫টি রাইড শেয়ারিং কোম্পানি কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে বাজারের মূল
অংশ প্রায় সবসময় তিনটি প্রধান কোম্পানির দখলে। এই কোম্পানিগুলোর অধীনে কতজন চালক যাত্রী
পরিবহন সেবা দিচ্ছেন, তার সঠিক তথ্য নেই। তবে খাতের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের ধারণা
সংখ্যাটি লাখের ঘরে।
বাংলাদেশে অ্যাপভিত্তিক
রাইড শেয়ারিং সেবা চালু ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বিআরটিএ ২০১৭ সালে নীতিমালা প্রকাশ করে।
নীতিমালার মূল লক্ষ্য যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। নীতিমালা অনুযায়ী,
সব রাইড শেয়ারিং কোম্পানি এবং যানবাহনকে বিআরটিএ থেকে এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট নিতে
হবে। কোম্পানির অফিস থাকতে হবে, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও টিআইএন নিবন্ধন থাকতে হবে। গাড়ির
ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক শর্ত হলো ট্যাক্স এবং রুট পারমিট আপডেট থাকা এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক
গাড়ি সক্রিয় রাখা।
ভাড়া নির্ধারণ
‘ট্যাক্সি সার্ভিস গাইডলাইন‑২০১০’ অনুযায়ী হতে হবে অ্যাপ বা কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে অতিরিক্ত আদায় অনুমোদিত
নয়। নীতিমালায় যাত্রী ও চালকের ডিজিটাল তথ্য, ট্র্যাকিং, জরুরি যোগাযোগ ও অভিযোগ ব্যবস্থা
থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন ভঙ্গ করলে লাইসেন্স বাতিল বা মামলার সুযোগ রাখা হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে কারও একটা বাইক থাকলেই তিনি রাইড শেয়ারিং করেন, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি
বাড়াচ্ছে।
সেন্টার ফর সিটিজেনস
রাইটস (সিসিআর) নির্বাহী পরিচালক রাহাত হুসাইন বলেন, বর্তমানে উবারের বদলে কন্ট্রাক্টে যাতায়াত বাড়ায় লোকেশন ট্র্যাকিংসহ
নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। এতে নারী ও সাধারণ নাগরিক ঝুঁকিতে। নিবন্ধিত রাইড শেয়ার উৎসাহ,
নজরদারি ও সচেতনতা বাড়িয়ে নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করাই এখন জরুরি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
পরিবহন ও যোগাযোগ
বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিশ্বজুড়ে যেখানে
রাইড শেয়ারিং একটি সমাদৃত ও কার্যকর পরিবহন মডেল, সেখানে বাংলাদেশে এই ব্যবস্থাকেই
আমরা ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। তার মতে, দেশে রাইড শেয়ারিং সেবার মূল লক্ষ্য ছিল নিরাপদ,
স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর যাতায়াত নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে এই খাত এখন গভীর বিশৃঙ্খলার
মধ্যে।
কমিশন এড়ানো এবং
কম ভাড়ার আশায় চালক ও যাত্রী উভয়ই অ্যাপের বাইরে ‘কন্ট্রাক্টে’ যাতায়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। এতে যাত্রী নিরাপত্তা মারাত্মক
ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং পুরো খাতের ওপর মানুষের আস্থা ক্রমে কমে যাচ্ছে। এই সংকটের দায়
শুধু সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো যায় না বলে মনে করেন তিনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর
দুর্বল তদারকি এবং রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর গাফিলতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আধুনিক নীতিমালা ও ডিজিটাল নম্বর প্লেটের মতো প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর কার্যকর
প্রয়োগ ও নজরদারির অভাবে পুরো উদ্যোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। এর ফলে প্রযুক্তিনির্ভর
এই সেবা আবার ধীরে ধীরে অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে।