ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৩ এএম
আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২৮ এএম
যথাসময়ে অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় অনেক কাজ না করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে পূর্ণাঙ্গরূপে সংসদের অধিবেশন শুরু করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ছবি: সংগৃহীত
আর মাত্র পাঁচ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সংসদের অধিবেশন আয়োজনের প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছে সংসদ সচিবালয়সহ দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো। এদিকে ভোটের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নির্বাচন-উত্তর সময়ে নতুন সরকার গঠন ও মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ নিয়ে ব্যস্ততা বাড়ছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নতুন সরকারের সম্ভাব্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের জন্য প্রায় ৫০টি সরকারি যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তবে সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে গত ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ ভবনকে অধিবেশনের উপযোগী করে গড়ে তোলার নির্দেশ থাকলেও তার বাস্তবায়ন ঘটেনি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যথাসময়ে অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় অনেক কাজ না করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে পূর্ণাঙ্গরূপে সংসদের অধিবেশন শুরু করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষ, শপথকক্ষ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংসদ উপনেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের কক্ষসহ নয়তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষই তছনছ হয়।
এ সময় একই সঙ্গে সংসদ এলাকায় অবস্থিত স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের ভিআইপি বাসভবনসহ সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বাড়িগুলোতেও ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।
এর প্রায় এক মাস পর সংসদ সচিবালয় সংসদ ভবন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা প্রস্তুত করে। যাতে শুধু বৈদ্যুতিক খাতেই ক্ষতি চিহ্নিত হয় ৭৩ কোটি টাকার। সিভিল ও ইলেকট্রো মেকানিক্যাল ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিত হয় প্রায় দেড়শ কোটি টাকার। কিন্তু নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য এই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপূর্ত অধিদপ্তর এই ক্ষয়ক্ষতি ও সংস্কারের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিল। তাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল। যার সংস্থান করতে পারেনি অধিদপ্তরটি। তবে জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে সমপরিমাণ অর্থের নির্মাণ ও সংস্কারের নির্দেশনা ছিল।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, ভবনের প্লেনারি হলের ক্ষতিগ্রস্ত এসআইএস সিস্টেম সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ ধরা হলেও বাজেটস্বল্পতার কারণে তা জোড়াতালি দিয়ে করা হয়েছে। মাত্র ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করায় এর স্থায়িত্ব এবং কার্যক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপূর্ত ইএম বিভাগ-৭ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কাজটি যেভাবে সংস্কার করা হয়েছে তাতে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আমরা প্রতিটি মাইক্রোফোন চেক করে দেখেছি। সেগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে। সফটওয়্যার থেকে দেওয়া কমান্ডও পুরোপুরি সক্রিয় হয়েছে। আমরা সংসদ ভবনের ভেতরের ইলেকট্রিক ওয়্যারিংও সঠিকভাবে প্রতিস্থাপন করতে পেরেছি।’
গণপূর্ত কাঠের কারখানার নির্বাহী প্রকৌশলী জুবায়ের বিন হায়দার বলেন, ‘প্লেনারি হলের অনেকগুলো চেয়ার ভেঙে ফেলা হয়েছিল। কার্পেটে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত চেয়ারগুলো ছাড়াও অধিবেশন কক্ষের ৩৫৪টি চেয়ারই সংস্কার করা হয়েছে। ভিআইপি কক্ষগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত আসবাবও সংস্কার করা হয়েছে। সংসদ ভবন এবং সংসদ সদস্য ভবনের আসবাবগুলো সংস্কারের কাজও চলছে।
এসি ছাড়াই এমপিদের অফিস
অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ায় জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন এমপি হোস্টেলে সংসদ সদস্য অফিসে এসি বসানো যাচ্ছে না। এখানে ১৯৬টি অফিসের জন্য ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি।
ভিআইপি অফিসেও বিকল্প ব্যবস্থা থাকছে না
জাতীয় সংসদের মূল ভবনে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, চিফ হুইপ হুইপ ও সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের জন্য ৭২টি অফিস রয়েছে। সংসদ ভবনের কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে এই অফিসগুলোতে। তবে বিগত সময়ে এসব অফিসে এসির ব্যবস্থা ছিল। এ খাতে চাওয়া ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকার বরাদ্দ না দেওয়ায় সেগুলোতেও এসি লাগানো যাচ্ছে না।
ভিআইপি বাসাবাড়ি সংস্কারেও বরাদ্দ নেই
জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন ছাড়াও ১২টি ভিআইপি বাংলোসহ ৭৬টি উচ্চমান বাসভবন রয়েছে। এসব বাসভবনে ইলেকট্রোমেকানিক কাজের জন্য আড়াই কোটি টাকা চাওয়া হলেও তা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
সিসি টিভিতেও বরাদ্দ নেই
সংসদ ভবন এলাকা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি কেপিআইভুক্ত হওয়ার পরও ৫ আগস্টে ক্ষতিগ্রস্ত সিসিটিভিগুলো সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সংসদ ভবন ও অভ্যন্তরীণ ক্যাম্পাসের সার্ভিলেন্সের জন্য মাত্র ৮০ লাখ টাকা বাজেট চাওয়া হয়েছিল। এই অর্থও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনার নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
সরেজমিন যা দেখা গেল
সরেজমিন দেখা গেছে সংসদ ভবন এলাকা ধোয়া-মোছার কাজ চলছে। সংসদের লেক পরিষ্কার করা হচ্ছে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার টানেলে হাই-ফ্লো ওয়াটার গান দিয়ে পরিষ্কারের কাজ চলছে। এমপি হোস্টেলের বিভিন্ন ব্লকে লাইট-ফ্যান ও কেবল স্থাপন করা হচ্ছে। ভবনটিকে আবারও সচল ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার কাজ চলমান।
এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হলেও সরকারের কাছ থেকে সব পাওয়া যায় না।
“এক্ষেত্রে আমরা কৌশলীভাবে জরুরি সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে জাতীয় সংসদ ভবনকে অধিবেশনের উপযোগী করে তুলেছি। অধিবেশন চালাতে কোনো সমস্যা হবে না। অল্প সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে।”
মন্ত্রিসভার জন্য প্রস্তুত ৫০ গাড়ি
সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়ার পর নতুন সরকারের সম্ভাব্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের জন্য ৫০টি সরকারি যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব গাড়িতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মনোগ্রাম ও জাতীয় পতাকা টাঙানোর স্ট্যান্ড সংযুক্ত করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রস্তুত করা ৫০টি গাড়িতেই প্রাথমিকভাবে প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার মনোগ্রাম লাগানো হবে। একই সঙ্গে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের জন্য পতাকা স্ট্যান্ড বসানো হয়েছে।”
তিনি বলেন, “যেসব গাড়ি পূর্ণ মন্ত্রীদের জন্য বরাদ্দ হবে, সেগুলোতে প্রতিমন্ত্রী লেখা স্টিকার খুলে ফেলা হবে এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। আর যেসব গাড়ি প্রতিমন্ত্রীদের বরাদ্দ দেওয়া হবে, সেখানে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না। আগের সরকারের অভিজ্ঞতা থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের ব্যস্ততা বেড়েছে
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার পর সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর (জিভিডি) দ্রুত কাজ সম্পন্ন করেছে। সচিবালয় লিংক রোডে অবস্থিত এই দপ্তরের গ্যারেজগুলোতে একাধিক গাড়িতে মনোগ্রাম, স্টিকার ও পতাকা স্ট্যান্ড বসানোর কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। গাড়িগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যেই রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, “এটি রাজনৈতিক নয়, সম্পূর্ণ প্রশাসনিক প্রস্তুতি। সংসদ নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকার গঠিত হবে। মন্ত্রিসভার গাড়ি, পতাকা ও মনোগ্রাম কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও দায়িত্বের প্রতীক।”