আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:১৭ এএম
বিএনপি প্রার্থী ইশরাক হোসেন বাঁয়ে ও জামায়াত প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঢাকা-৬ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে আছেন ইশরাক হোসেন। তিনি এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার সন্তান। নিজেও নির্বাচন করেছেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে। আদালত রায় দিলেও মেয়র পদে শপথ না পেয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। ইশরাক হোসেনের সঙ্গে এবার এমপি হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন আরও ৬ প্রার্থী। এর মধ্যে জামায়াতের ড. আব্দুল মান্নানের সঙ্গেই হবে মূল লড়াই। নির্বাচনী এলাকায় এই দুই প্রার্থীর প্রচার তুঙ্গে থাকলেও অন্য প্রার্থীদের নাম জানেন না এলাকার ভোটাররা।
সোমবার ঢাকা-৬ নির্বাচনী এলাকার টিকাটুলি, গোলাপবাগ, ওয়ারী ও তাঁতিবাজার এলাকায় ঘুরে সাধারণ মানুষ ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য। ঢাকা-৬ আসনে ভোটার ২ লাখ ৯২ হাজার ২৮৩ জন। তাদের মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ২ হাজার ৮৬৭ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার তিনজন।
এই নির্বাচনী এলাকা পুরনো ঢাকার সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, ওয়ারী থানার পুরোটা, কোতোয়ালি ও বংশালের আংশিক নিয়ে গঠিত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড এবং ৩৭ থেকে ৪৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী এলাকায় দেশের অন্যান্য এলাকার লোকের বসবাস বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক হওয়ায় এ এলাকায় নাগরিক সমস্যাও বেশি। সরু রাস্তা, জলাবদ্ধতা, যানজট, পরিবেশদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গ্যাস ও পানির সংকট প্রকট।
অভয়দাস লেনের ফুটপাথে কলা বিক্রি করেন সাজ্জাদ হোসেন। তিনি থাকেন গোলাপবাগ হুমায়ুন সাহেবের বাড়ির পাশে। জানালেন, ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি থেকে দুর্গন্ধ আসে। যা খাওয়া তো যাচ্ছেই না, গোসল করাও কঠিন। গত সপ্তাহে এ এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে এসেছিলেন ইশরাক হোসেন। তাকে এসব সমস্যার কথা বলা হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত জামায়াত বা অন্য কোনো দলের প্রার্থী ভোটের প্রচারে আসেননি। অদূরে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে একটি রিকশায় মাইকে রেকর্ডকৃত নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে দেখা যায়।
এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে হলেও জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন আমির উদ্দিন আহমেদ ডালু, গণফ্রন্টের ‘মাছ’ প্রতীকে আহম্মেদ আলী শেখ, ‘ডাব’ প্রতীকে বাংলাদেশ কংগ্রেসের ইউনুস আলী আকন্দ এবং ‘হারিকেন’ প্রতীকে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের আকতার হোসেন। ‘ট্রাক’ প্রতীক নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের ফখরুল ইসলাম মাঠে নেমেছিলেন। মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়ের পরে ইশরাক হোসেনকে সমর্থন জানিয়ে ভোট থেকে সরে গেলেও ব্যালটে তার নাম ও প্রতীক থাকছে। এদের মধ্যে জাতীয় পার্টির আমির উদ্দিন ডালুর কিছুটা প্রচার দেখা গেলেও বাকি প্রার্থীদের প্রচার বা গণসংযোগ কোনোটাই চোখে পড়ার মতো নয়।
নির্বাচনী এলাকায় ইশরাক হোসেনের যেমন পরিচিতি রয়েছে, ঠিক ততটা পরিচিতি নেই জামায়াতের প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নানের। ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি শিবিরের ঢাকা মহানগরী পশ্চিম শাখার সভাপতি ছিলেন। এ আসনে তিনি অতটা পরিচিত না হলেও জামায়াতের ইমেজ আর ১০-দলীয় জোটের সম্মিলিত ভোটের হিসাবকে মাথায় রেখে এগোচ্ছেন তিনি। ইতঃপূর্বে এই আসনে জামায়াতের উল্লেখযোগ্য ভোট পাওয়ার রেকর্ড নেই। এমনকি ১৯৯৬ সালের পর প্রথম এই আসনে জামায়াত প্রার্থী দিয়েছে।
ভোটের মাত্র ৯ দিন আগেও এই আসনে নির্বাচনী আমেজ মানুষকে অতটা ছুঁয়ে যেতে পারেনি। ঢাকার অন্যান্য আসনের মতো এখানে নির্বাচনী প্রচারণা যেমন জমজমাট নয়, তেমনি সহিংসতাপূর্ণও নয়। এলাকায় একটি শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। ভোটাররা এই পরিবেশ নিয়ে বেশ খুশি, বিশেষ করে এই এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। জয়কালী মন্দিরের সামনে ইকরা পরিবহনের সামনে কথা হয় ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আশিষ ঘোষের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলে ভোটকেন্দ্রে যাব।’ তার মতে, নির্বাচনী পরিবেশ সহিংস না হলে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে।
ওয়ারীর বলধা গার্ডেনের পাশেই কথা হয় লাকী বাছারের সঙ্গে। তিনি দুই দশক ধরে এই এলাকায় বসবাস করেন কিন্তু ভোটার অন্য এলাকায়। তিনি বলেন, আগে এই এলাকাটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ছিল বসবাসের জন্য। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই এলাকায় চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। এছাড়া পানি ও গ্যাসের সমস্যা তো আছেই। এগুলোর সমাধান হওয়া জরুরি।
এই নির্বাচনী এলাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক। হাত বাড়ালেই মাদক পায় তরুণ সমাজ। এটাকে সবচেয়ে বড় সামাজিক সমস্যা মনে করছেন মাংস বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন। তার মতে, নির্বাচনে কে জিতবে আর কে হারবে, তা তাদের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু মাদকের কারণে বাচ্চাদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত থাকেন সবসময়।
ইশরাক হোসেন ও আব্দুল মান্নান প্রতিদিনই নির্বাচনী এলাকায় সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ করছেন। সোমবার ধুপখোলা মাঠে ইশরাক হোসেনের সমাবেশে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি বিএনপি-নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেছে। এখানেই এলাকার বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এলাকাবাসীর কাছে ওয়াদা করেছেন, বাবার মতোই এলাকার মানুষের সেবা করবেন।
ঠিক ইশরাকের মতো না হলেও দাঁড়িপাল্লার আব্দুল মান্নান বিভিন্ন সভা, সমাবেশ ও গণসংযোগকালে বলেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার সম্প্রীতি বজায় রাখাসহ সরকারি সকল বরাদ্দ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত পুরান ঢাকা বিনির্মাণে কাজ করবেন তিনি।