কাউসার আহমেদ (ঢাকা), তারাচরন টিপু (চট্রগ্রাম)
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৪৫ এএম
আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০১:১৭ এএম
নির্বাচন এলেই রাজধানীর ছাপাখানাপাড়ায় কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ার যে চিরচেনা দৃশ্য দেখা যেত, এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। পোস্টার, লিফলেট ও ব্যানার ছাপানোর ব্যস্ততায় রাতদিন একাকার হয়ে থাকত ফকিরাপুল, আরমানিটোলা ও আশপাশের এলাকার ছাপাখানাগুলো। তবে এবারের নির্বাচনে সেই চিত্র আর চোখে পড়ছে না। কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ থাকায় ছাপাখানাগুলোতে নেই আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য। বরং অনেক প্রেসে কাজ না থাকায় মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশবান্ধব নির্বাচন নিশ্চিত করতে কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এর সঙ্গে জড়িত ছাপাখানা শিল্পের শ্রমিক ও মালিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের বিষয়টিও ভাবা জরুরি। কারণ একটি সিদ্ধান্ত যেমন শহরের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষা করছে, তেমনি আরেকদিকে তা প্রভাব ফেলছে বহু মানুষের জীবিকায়। নির্বাচনী সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের এই সময়ে ছাপাখানাপাড়ার নীরবতা যেন সেই পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবিÑযেখানে পরিবেশের লাভ হলেও কর্ম হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে শ্রমজীবী মানুষের।
রাজধানীর ফকিরাপুলের ‘চৌধুরী প্রেস অ্যান্ড বাইন্ডিং’-এর মালিক রেজওয়ান খান আক্ষেপ করে বলেন, নির্বাচন মানেই আগে আমাদের জন্য ব্যস্ত সময়। প্রচুর পোস্টার ছাপা হতো, দিন-রাত কাজ করতে হতো। কিন্তু এবার সেই চাপ নেই। সরকার কাগজের পোস্টার নিষেধ করে দিছে। ফলে যে কাজগুলো আসত, সেগুলো আর আসছে না। বর্তমানে কিছু লিফলেটের অর্ডার থাকলেও তা দিয়ে প্রেস চালানোর মতো না। সামনে বইমেলা থাকায় বই ছাপানোর কাজ দিয়েই প্রেস চালু রাখা হয়েছে।
গতকাল রবিবার সরেজমিন ফকিরাপুলের প্রেসপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচনী সময়ের চেনা ব্যস্ততা এবার নেই। বই ছাপার কাজ চলছে বেশিরভাগ প্রেসে, দুয়েকটিতে সীমিত লিফলেট ছাপা হচ্ছে। চট্টগ্রাম নগরীতেও একই চিত্রÑঅনেক প্রেসের মেশিনই বন্ধ, কর্মীরা কাটাচ্ছেন অলস সময়। প্রেসে কর্মরত লোকমান হাবিবের বয়স ৩৫ বছর। তিনি ১০ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। হতাশ কণ্ঠে লোকমান বলেন, এত বছরের অভিজ্ঞতায় এবারকার মতো কম কাজ কখনও দেখিনি। নির্বাচন এলেই আগে কাজের চাপ সামলানো যেত না। এখন বই ছাপিয়েই কোনোমতে প্রেস চলছে। বাড়তি কাজ নেই বললেই চলে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার
কথা জানান আশিক প্রিন্টারের কর্মচারী হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, এখন সামান্য কোচিংয়ের
বই ছাপাচ্ছি। সপ্তাহখানেক আগে কিছু লিফলেটের কাজ ছিল, সেটাও খুব কম। এ বছর আমাদের কর্মব্যস্ততা
পুরাই কমে গেছে। আগে এই সময় ওভারটাইম করে বাড়তি টাকা পেতাম, সেটাও এখন বন্ধ।
ছাপাখানার নীরবতার
মধ্যে কাপড়ের ব্যানার তৈরির কারখানাগুলো ব্যস্ত। জাতীয় ঈদগাহ এলাকায় রমিজউদ্দিনের টিম
সকাল থেকে ১০০টি ব্যানার তৈরি করেছেন। কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় অর্ডার বেড়ে ৫০০,
শ্রমিক কম ও দক্ষতা সীমিত হওয়ায় চাপ বাড়ছে। রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ এলাকার পাশে হাতে
হাতুড়ি নিয়ে ব্যানারে কাঠের ফ্রেমে পেরেক ঠুকতে ব্যস্ত দেখা যায় রমিজউদ্দিনকে। তিনি
জানান, সকাল থেকে দুপুর ১২টার মধ্যেই তারা ১০০টি ব্যানার তৈরি করেছেন। কাগজের পোস্টার
নিষিদ্ধ করায় কাপড়ের ব্যানারের ওপর চাপ বেড়েছে। আজকের মধ্যেই ৫০০ অর্ডার শেষ করতে হবে।
কিন্তু শ্রমিক কম, যারা আছে তারাও খুব একটা দক্ষ না। তাই সময়টা বেশ চাপের মধ্য দিয়ে
যাচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারে
কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেক সাধারণ মানুষ। হাবিবুর
বাশার নামের এক সরকারি কর্মচারী বলেন, নির্বাচনের সময় বাসার দেয়াল, গাড়ি, রিকশাÑসব
জায়গা পোস্টারে ছেয়ে যেত। শহর নোংরা হয়ে যেত, পরিবেশেরও ক্ষতি হতো। এবার সেই ভোগান্তি
থেকে রেহাই পাওয়া গেছে। পরিবেশের কথা চিন্তা করে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ প্রশংসার
যোগ্য।
নির্বাচনী আচরণবিধি-২০২৬
এর ৭(ক) ধারা অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না।
একই সঙ্গে অপচনশীল বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপকরণ দিয়ে ব্যানার, ফেস্টুন বা লিফলেট
ব্যবহার নিষিদ্ধ। কোনো দালান, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ বা টেলিফোনের খুঁটি, সরকারি
বা স্থানীয় কোনো স্থাপনায় পোস্টার লাগানো যাবে না। এমনকি বাস, ট্রাক, ট্রেন, স্টিমার,
লঞ্চ, রিকশা, লেগুনাসহ সব ধরনের যানবাহনেও লিফলেট, ব্যানার বা ফেস্টুন লাগানো নিষেধ।
বাংলাদেশ মুদ্রণ
শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ব্যবসায়ীরা এবার বড় ধরনের লোকসানের মুখোমুখি
হবেন। যেখানে আগে শতকোটি টাকার ব্যবসা হতো, এবার তা সম্ভব হবে না। যদি এই পরিস্থিতি
চলতে থাকে, ব্যবসায়ীরা হয়তো তাদের ব্যবসা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেবেন। শুধু ছাপার কাজ
নয়, পরিবহন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরাও আর্থিকভাবে লাভবান হতেন। সেই পথও এবার
বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম প্রেস
মালিক সমিতির সহসভাপতি মফিজুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচন এলেই আগে
পোস্টার আর লিফলেটে প্রেসে কাজের শেষ থাকত না। এখন সব মিলিয়ে কর্মচারীরা বসে বসে দিন
পার করছে। নির্বাচন থাকলেও কোনো আমেজ নেই। এখন
প্রার্থীরা আচরণবিধির কথা ভেবে পোস্টার না ছেপে শুধু লিফলেট দিচ্ছেন। তা-ও সীমিত সংখ্যায়।
একটি আসনে যেখানে প্রায় চার লাখ ভোটার, সেখানে লিফলেট ছাপানো হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ৩০
হাজার। ফলে নির্বাচনী মৌসুম হলেও প্রেস ব্যবসায় কোনো চাঞ্চল্য নেই।