প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:৩০ পিএম
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বানচালের প্রস্তুতি নিচ্ছেন রূপগঞ্জের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও যুবলীগ নেতা তারিকুল ইসলাম মোঘল। ছবি: সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বানচালের প্রস্তুতি নিচ্ছেন রূপগঞ্জের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও যুবলীগ নেতা তারিকুল ইসলাম মোঘল। এজন্য আওয়ামী লীগ আমলে তার নিজ হাতে গড়া সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীকে নতুন করে প্রস্তুত করা হয়েছে।
বাহিনীটিতে রয়েছে আড়াই শতাধিক প্রশিক্ষিত সশস্ত্র ক্যাডার। যারা অতীতে মোঘলের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পাশাপাশি জমি দখল, জুয়া, ক্যাসিনো, মাদক ও দেহ ব্যবসায় সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।
সূত্রের দাবি, সম্প্রতি দেশে ফিরে আসার পর আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ নেতাদের নির্দেশেই মোঘল নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে নির্বাচন বানচালের পরিকল্পনা নিচ্ছেন। ঢাকায় আত্মগোপনে থেকেই পলাতক নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের পাশাপাশি রাজধানীর অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক হত্যারও ছক কষছেন তিনি। এ কারণে এখনই তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমখি দাঁড় করানোর জোর দাবি উঠেছে।
গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, ঢাকার মিরপুরে দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় মোঘলের যোগসাজশ রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও অর্থের জোগানদাতা হিসেবেও তার নাম উঠে আসছে। এ ছাড়াও শহীদ ওসমান হাদি হত্যায় অভিযুক্ত মিরপুরের কাউন্সিলর বাপ্পীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগসূত্রের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বাপ্পী ও মোঘল দুজনেই একসময় যুবলীগের ক্যাডার ছিলেন। তারা রূপগঞ্জ ও মিরপুরের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। বিনিময়ে যুবলীগের নেতাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগেই এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন অনেকে। এজন্য তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে যেকোনো সময় বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারে।
জানা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিদেশে পালিয়ে গেলেও কয়েক মাস আগে রূপগঞ্জে ফিরে আসেন মোঘল। এরপর পলাতক নেতাদের পরামর্শে ঢাকায় আত্মগোপনে থেকে হত্যা-সন্ত্রাস ও নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মিছিল-মিটিং ঘিরে নাশকতা ঘটানোর ছকও কষা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র। তার এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে পরামর্শ ও হুকুমদাতা হিসেবে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসসহ একাধিক প্রভাবশালী নেতার নামও উঠে আসছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি সূত্রের দাবি, গত বছরের শেষ দিকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে আগুনের ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী মোঘলের নাম আসার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বিএনপির একটি পক্ষের সঙ্গে তার আঁতাত রয়েছে। ওই পক্ষটিকে নিয়মিত অর্থও দিয়ে থাকেন মোঘল।
সূত্রমতে, ২০২৪ সালের গত ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলের শীর্ষ নেতারা পালিয়ে যায়। পালিয়ে যান রূপগঞ্জের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোঘলও। কয়েক মাস পর দেশে ফিরে এসে বিএনপির একাংশের সঙ্গে আঁতাত করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেন তিনি। ওই নেতাকর্মীদের দিয়েই এখন নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী ও পাড় জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত মোঘলের রয়েছে একাধিক দেশে গোল্ডেন ও দীর্ঘমেয়াদি ভিসা। দুবাইতে তার রয়েছে ১০ বছরের গোল্ডেন ভিসা এবং থাইল্যান্ডে ২০ বছরের মাল্টিপল ভিসা। বিপদ আঁচ করলেই চোখের পলকে দেশ ছাড়ার সক্ষমতা তার রয়েছে। অর্থ পাচারের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত ক্যাসিনো খেলতে যান দুবাই, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কায়। একটি সূত্র জানিয়েছে, গত দেড় বছরে এসব দেশে ক্যাসিনো খেলে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হারিয়েছেন তিনি। ওই অর্থ রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোর-জুলুম, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
সূত্র বলছে, বিদেশে গেলে মোঘলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে দেয় স্থানীয় মাফিয়ারা। পাঁচ তারকা হোটেলে থাকা-খাওয়া, বিলাসী জীবন ও দেশি-বিদেশি নারীর সরবরাহÑ সবই নাকি ‘প্যাকেজ’। তার পছন্দের তালিকায় নেপালি ও আরব নারী থাকেন বলে অভিযোগ। দুবাইতে পলাতক একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গেও তার নিয়মিত বৈঠক হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার বড় বড় ক্যাসিনোতে মোঘলের বিশেষ সমাদর রয়েছে। মিরপুরের কুখ্যাত জুয়াড়ি মনির ওরফে আমেরিকান মনির ও সোহেল খান তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। মাঝেমধ্যে বিদেশে যেতে না পারলে দেশে বসেই ভার্চুয়ালি শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ার ক্যাসিনো কোর্টে খেলেন তিনি। প্রতিবার বিদেশ যাওয়ার আগে ১৫-২০ কোটি টাকা হুন্ডিতে পাঠানো হয় কামরুল নামে এক হুন্ডি ব্যবসায়ীর মাধ্যমে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত দেড় বছরে মোঘল অন্তত ১৭ বার দেশের বাইরে গেছেন। তার নামে দুটি পাসপোর্ট রয়েছে। ইমিগ্রেশন পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৭-২০১৯ সালে তিনি শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, দুবাই ও থাইল্যান্ডে ৫০ বারের বেশি যাতায়াত করেন।
গণমাধ্যমের হাতে আসা শ্রীলঙ্কার বেলিস ক্যাসিনোর টিকিট কপিতে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ তারিকুল ইসলাম মোঘল ও মনির উদ্দিনের নামে বিজনেস ক্লাসের টিকিট ইস্যু করা হয়, যেখানে তাদের ক্যাসিনো মেম্বারশিপ নম্বরও উল্লেখ রয়েছে।
সূত্র দাবি করছে, দুবাইতে মোঘলের রয়েছে অন্তত শত কোটি টাকার বাড়ি ও গাড়ি। বিনিয়োগকারী ক্যাটাগরিতে রেসিডেন্স কার্ড নেওয়ায় তিনি সেখানে ই-গেট দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করেন। সোনা চোরাচালানের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
রূপগঞ্জ থানা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল প্রতারণার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ আদালতে তার বিরুদ্ধে দুটি সিআর মামলা দায়ের হয়, যা তদন্তাধীন। ২০২৩ সালে হত্যাচেষ্টা, বাছির হত্যা, বাদশা মেয়রকে হত্যাচেষ্টা, আবুল বাশার মেয়রকে মারধর এবং ২০০৯ সালের মারামারির মামলাসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কাঞ্চন ও কেন্দুয়ার বাসিন্দারা বলছেন, তারা যেন মোঘল ‘সাম্রাজ্যের’ প্রজা। স্থানীয়দের দাবি, দুদক ও সিআইডি যদি এসব অপকর্ম তদন্ত করে, তাহলে চাঞ্চল্যকর সত্য বেরিয়ে আসবে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে এখনও কার্যকর তদন্ত শুরু হয়নি।