× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রশাসন

বঞ্চিতরা বঞ্চিতই থেকে গেলেন

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪৬ পিএম

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:১৩ পিএম

বঞ্চিতরা বঞ্চিতই থেকে গেলেন

গণঅভ্যুত্থানে সরকার বদলেছে। ক্ষমতার পালাবদলে প্রশাসনে ন্যায়বিচার ফিরবেÑ এমন প্রত্যাশা ছিল বছরের পর বছর বঞ্চিত কর্মকর্তাদের। বিশেষ করে, যারা সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের কারণে পদোন্নতি থেকে বারবার বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে ন্যায্য পুনর্মূল্যায়নের দাবি ছিল জোরালো। কিন্তু সম্প্রতি ১১৮ জন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপন তালিকা প্রশাসনে আবারও ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও বঞ্চনার চরিত্র কি একই রয়ে গেছে?

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. শামছুল আজম (৬৮০৯)। বর্তমানে তিনি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে যুগ্ম সচিব পদে কর্মরত। উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা থেকে উঠে আসা এই মানুষটি সহকর্মী ও অধস্তনদের কাছে পরিচিত মেধাবী, পরিশ্রমী ও পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে। মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বÑ কোথাও তার কাজের রেকর্ডে তেমন কোনো বিতর্ক নেই। বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন থেকে শুরু করে শৃঙ্খলা রেকর্ডÑ কোথাও তার বিরুদ্ধে তেমন কোনো নেতিবাচক মন্তব্য নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। যদিও তার প্রশাসনিক জীবনের বড় অংশজুড়েই রয়েছে বঞ্চনা। 

অভিযোগ, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে বিএনপি-জামায়াতপন্থী হিসেবে ‘ট্যাগ’ করা হয়। বলা হয়, তার পরিবার বিএনপির কঠোর সমর্থক। এর পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকলেও এই ট্যাগিংই হয়ে ওঠে তার পদোন্নতির জন্য নীরব অভিশাপ। একাধিকবার পদোন্নতির যোগ্য হয়েও তিনি তালিকার বাইরে থেকে যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে অভ্যুত্থানের পর প্রশাসনে এক নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে শফিকুল আজম যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পান। শুধু শফিকুল আজম নন, মো. নুরুজ্জামান, ড. আমিনুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম চৌধুরী, বরাদ হোসেন চৌধুরীসহ আরও অনেকেই এই পদোন্নতি পান। কিন্তু বঞ্চনার পুরো অবসান ঘটেনি। কেননা পরবর্তী সময়ে কাঙ্ক্ষিত অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতির তালিকায় তারা আর তাদের নাম খুঁজে পাননি। ফলে তালিকা প্রকাশের পরপরই প্রশাসনের ভেতরে নতুন করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। যদিও এই কর্মকর্তাদের অনেকেই কাগজে-কলমে পদোন্নতির যোগ্য। তাদের কেউ ব্যাচভিত্তিক জ্যেষ্ঠতায় এগিয়ে, কেউ দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার কেউ মাঠ প্রশাসনে কঠিন সময় সামলেছেন দক্ষতার সঙ্গে।

ব্যাচভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা বনাম ‘অদৃশ্য বিবেচনা’ 

প্রশাসনে পদোন্নতির অন্যতম মূলনীতি হলো, ব্যাচভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা, বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন, শৃঙ্খলা রেকর্ড ও কর্মদক্ষতা। কিন্তু বাস্তবে এর বাইরেও একটি অদৃশ্য বিবেচনার কথা প্রশাসনের ভেতরে সর্বজনবিদিত। সেটি হলো রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। ২০তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাদের অনেকেই বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য কাগজে-কলমে পুরোপুরি যোগ্য। অথচ তালিকায় স্থান পেয়েছেন অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ বা বিতর্কিত একাধিক কর্মকর্তা, যারা বিগত সরকারের আমলে যেমন নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন, তেমনি সুবিধাজনক মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কাজ করেছেন। 

একজন বঞ্চিত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তারা আওয়ামী লীগ আমলেও বাদ পড়েছেন, এখন আওয়ামী লীগ নেইÑ তবুও বাদ পড়েছেন। পদোন্নতির প্রকৃত মানদণ্ড তা হলে কী?

এসএসবি নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) হলো সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা। এই বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু সাম্প্রতিক পদোন্নতি তালিকা ঘিরে এসএসবির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অংশ ইতোমধ্যে পুনর্বিবেচনার জন্য এসএসবির চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, বোর্ডে আলোচনার সময় ফ্যাসিস্ট আমলের ‘নেগেটিভ নোটিং’, গোয়েন্দা সংস্থার পুরনো পর্যবেক্ষণ এবং রাজনৈতিক ছাপ এখনও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঞ্চিত এক যুগ্ম সচিব বলেন, যদি অন্তর্বর্তী সরকার সত্যিই প্রশাসনকে রাজনীতিমুক্ত করতে চায়, তাহলে এসএসবির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও ডকুমেন্টেড করতে হবে।


প্রশাসনে ক্ষোভ ও মনোবল সংকট

এই বঞ্চনার প্রভাব শুধু কয়েকজন যুগ্ম সচিবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি গোটা প্রশাসনে মনোবল সংকট তৈরি করছে।

এ বিষয়ে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন যদি বারবার বঞ্চনার সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যায়, তাহলে সেটি শুধু কর্মকর্তাদের নয়, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের দক্ষতাকে দুর্বল করে দেয়। গণঅভ্যুত্থাণে সরকার পরিবর্তনের পর সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত ছিল অতীতের রাজনৈতিক ট্যাগিং পুরোপুরি বাতিল করা। কিন্তু প্রশাসনের কাঠামো ও মানসিকতায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ছায়া এখনও পুরোপুরি কাটেনি।’ 

তিনি মনে করেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে একটি দল ক্ষমতায় থাকলে প্রশাসনের ভেতরে তাদের অনুকূল একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। সরকার পরিবর্তনের পর সেই নেটওয়ার্ক ভাঙতে সময় লাগে, কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে অসম্ভব নয়। যেসব কর্মকর্তা রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের জন্য বিশেষ পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা যায়।’

সূত্র মতে, বঞ্চিত কর্মকর্তারা সংগঠিতভাবে নয়, ব্যক্তিগতভাবে পুনর্বিবেচনার আবেদন করছেন। তবে প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা চলছেÑ যদি এই দাবি উপেক্ষিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে। 


ক্ষমতার পালাবদলেও ‘সুবিধাভোগীদের’ দাপট

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি তালিকাকে আরও বিতর্কিত করেছে আরেকটি বাস্তবতা। পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত এমন পাঁচজন আছেন, যারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো শাসনামলেই নিয়মিত পদোন্নতির সুবিধা পেয়ে এসেছেন। প্রশাসনের ভেতরে তারা পরিচিত ছিলেন প্রকাশ্য আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তা সুবিধাজনক জেলায় এসি ল্যান্ড, ইউএনও ও উপসচিব থেকে শুরু করে যুগ্ম সচিব প্রতিটি ধাপেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মাঠ প্রশাসনে তারা দলীয় স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ছিলেন বলে সহকর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করেন। এর ফল হিসেবে তারা বারবার পেয়েছেন তথাকথিত ‘প্রাইস পোস্টিং’–গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদায়ন। অন্যদিকে, যারা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন বা যাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অপবাদ ছিল, তারা হয়েছেন বঞ্চিত। 

এমন প্রেক্ষাপটে প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, যারা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকাশ্যে দলীয় দোসর হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তারা আজ নতুন বাস্তবতায়ও কীভাবে আবার পদোন্নতির তালিকায় জায়গা করে নেন? আর যারা সেই একই সময় রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের শিকার হয়েছেনÑ বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের জন্য কি কোনো ‘রিসেট বাটন’ নেই? এই বৈপরীত্য প্রশাসনের ভেতর ক্ষোভকে তীব্র করছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা