ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪২ এএম
ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়াকে সাইবার ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা একে ‘ভয়ংকর সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট আপত্তি এবং বিদ্যমান নীতিমালায় সুযোগ না থাকার পরও বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বাংলাদেশের ই-পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কনসুলার সেবা তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও নীরব ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
এতে দেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মসনদ, বায়োমেট্রিক তথ্যসহ অতি সংবেদনশীল সব তথ্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাইবার ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা একে ‘ভয়ংকর সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করছেন।
মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) প্রদানে সহায়তার জন্য দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেলের সঙ্গে মালয়েশিয়া ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফশওয়া এসডিএন বিএইচডির স্থানীয় অপারেটর ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি, দুবাইয়ের যে চুক্তি ছিল, সেটির পরিধি বাড়িয়ে এখন ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য কনসুলার সেবা দেওয়ার অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ ওই চুক্তিতে ই-পাসপোর্ট বা অন্যান্য কনসুলার সেবার কোনো উল্লেখ নেই। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
চুক্তির বাইরে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে করা ওই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল শুধু এমআরপি পাসপোর্ট প্রদানে সহায়তা। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিবেচ্যপত্রের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এতে ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি যাতে ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য কনসুলার সেবা পরিচালনা করতে পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমআরপি ও ই-পাসপোর্টের প্রযুক্তিগত কাঠামো ও তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি এক নয়। ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে নাগরিকের বায়োমেট্রিক তথ্য, সার্ভার সংযোগ এবং রিয়েল-টাইম ডেটা ট্রান্সফার জড়িত। ফলে চুক্তির বাইরে গিয়ে এ ধরনের দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া মানেই রাষ্ট্রের অতি সংবেদনশীল তথ্য ঝুঁকির মুখে ফেলা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট আপত্তি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে পাসপোর্ট সেবা দিতে আউটসোর্সিং এজেন্ট নিয়োগের বিষয়ে মতামত চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। এর জবাবে একই বছরের ২৭ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো মতামত স্মারকে পরিষ্কারভাবে জানানো হয়, ‘এভাবে বৈদেশিক মিশনে আউটসোর্সিং সেবা ক্রয়ের সুযোগ নেই।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের উপসচিব কাজী লুতফুল হাসান স্বাক্ষরিত ওই স্মারকে আরও বলা হয়, অর্থ বিভাগের জারি করা আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫ কার্যকর থাকা অবস্থায় বিদেশের বাংলাদেশ মিশনে আউটসোর্সিং সেবা কেনার সুযোগ নেই। তা ছাড়া বিদেশের মিশনগুলোতে রাজস্ব খাতের জনবল ও স্থানীয় ভিত্তিক কর্মী থাকায় বিদ্যমান জনবল দিয়েই পাসপোর্ট সেবা দেওয়া সম্ভব। ফলে আলাদা কোনো নীতিমালারও প্রয়োজন নেই। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই স্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অসম্মতির পরও থেমে নেই এ উদ্যোগ। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর একই বছরের ১১ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (কনসুলার) তানভীর আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে আবারও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়, ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি যেন ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণসহ সব কনসুলার সেবা পরিচালনা করতে পারে। এরপর ১৪ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমআরপি সেকশন থেকে স্বরাষ্ট্র সচিবকে ইমেইল পাঠিয়ে একই অনুরোধ আবারও জানানো হয়। নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অনুরোধগুলোতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কোনো উল্লেখ নেই।
চুক্তিতে নেই, তবুও প্রস্তুতি সম্পন্ন
দীর্ঘ পৃষ্ঠায় প্রস্তুতকৃত নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর ফশওয়া গ্লোবাল ডকুমেন্টস কপিং সার্ভিস কোম্পানি এলএলসি, দুবাইয়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা গোলাম এম এ আর চিশতী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে স্বরাষ্ট্র সচিবকে জানানো হয়, দুবাইতে ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট কার্যক্রম শুরু করতে প্রযুক্তিগত, অবকাঠামোগত ও মানবসম্পদ সংক্রান্ত সব প্রস্তুতি তারা ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, এখন শুধু ডিপার্টমেন্ট অব ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্টের (ডিআইপি) প্রযুক্তিগত দলের মাধ্যমে সরঞ্জাম ইনস্টলেশন, কনফিগারেশন ও নেটওয়ার্ক সংযোগ বাকি আছে। অন্য একটি চিঠিতে দুবাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেলকে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের সেবা কেন্দ্রের এনরোলমেন্ট স্টেশনের সঙ্গে কনসুলেট জেনারেলের ই-পাসপোর্ট সার্ভারের রিয়েল-টাইম সংযোগ, সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান এবং সুরক্ষিত ডেটা ট্রান্সফার লাইনের মাধ্যমে তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও সংস্কার কাজ চলছে। চিঠিতে এটিকে ‘অতি সংবেদনশীল কাজ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, এই সংবেদনশীল কাজ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বৈধতা কোথায়?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরে ক্ষোভ ও নীরব প্রতিবাদ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ই-পাসপোর্ট প্রক্রিয়ার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে তারা শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন। বহিরাগমন উইংয়ের অতিরিক্ত সচিবকে সম্ভাব্য ঝুঁকি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব জনবল দিয়েই বিদেশি মিশনে এই সেবা আরও দক্ষ ও পেশাদারভাবে দেওয়া সম্ভব। তাই এমআরপি-সংক্রান্ত বিদ্যমান চুক্তি মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত সীমিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু সে অনুরোধ উপেক্ষা করেই ই-পাসপোর্টসহ সব কনসুলার সেবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে।
চূড়ান্ত অনুমোদনে রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, এই অতি সংবেদনশীল নথি অনুমোদনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতার পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও সাবেক এমপি নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে বিদেশি ওই প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ ছিল। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি মালয়েশিয়ায় একই প্রক্রিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছিলেন। তখন তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনেকের মতো সাবেক এমপি নিক্সন চৌধুরীও বিদেশে পালিয়ে যান। এরপর তার অনুপস্থিতিতে ওই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে দেশের বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের একজন প্রভাবশালী নেতা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন, এমন অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানাচ্ছে, এই প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার ইন্ধনও রয়েছে।
চুক্তির মেয়াদ দেখিয়ে যুক্তি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ কনসুলেট জেনারেল, দুবাই ও ফশওয়া এসডিএন বিএইচডির স্থানীয় অপারেটরের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। তাই ওই সময়কালে ই-পাসপোর্টসহ অন্যান্য কনসুলার সেবা আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে দেওয়া যেতে পারেÑ এমন যুক্তি দেখিয়ে বিবেচ্যপত্রে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু আইন ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তির মেয়াদ থাকলেই চুক্তির বাইরে কোনো কাজ দেওয়া যায় না। প্রতিটি সেবার জন্য আলাদা অনুমোদন, নীতিমালা ও আর্থিক সম্মতি প্রয়োজন।
যেভাবে তথ্য বেহাত হতে পারে
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট মানে শুধু আবেদন গ্রহণ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নাগরিকের বায়োমেট্রিক তথ্য, এনআইডি ও জন্মসনদের ডেটাবেস ও ইমিগ্রেশন সার্ভারের রিয়েল-টাইম সংযোগ। এই প্রক্রিয়ায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে সার্ভার অ্যাকসেস গেলে তথ্য চুরি, অপব্যবহার বা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. তানভীর হাসান জোহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এটা শুধু দুবাই প্রবাসীদের বিষয় না। একবার নজির তৈরি হলে গোটা দেশের নাগরিক তথ্যই ঝুঁকিতে পড়বে। আউটসোর্সিং হলে সেবার খরচ বাড়ার পাশাপাশি জবাবদিহি কমে যায়। প্রবাসীদের হয়রানি, দালালচক্র সক্রিয় হওয়া এবং সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়েরও আশঙ্কা রয়েছে।
তার মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল ডেটা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া মানে ভবিষ্যতে বড় বিপদের দরজা খুলে দেওয়া।
এ বিষয়ে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট আপত্তি, নীতিমালার সীমাবদ্ধতা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেতরের প্রতিবাদ এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাÑ সবকিছু উপেক্ষা করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ই-পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কনসুলার সেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ। এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধু দুবাই প্রবাসী নয়, গোটা দেশের নাগরিকদের তথ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ হুমকির মুখে পড়তে পারে।’