আবু কাওসার
প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:৩২ পিএম
প্রধান উপদষ্টার কাছে পে-স্কেলের রিপোর্ট পেশ
সরকারি চাকরিজীবীদের সুখবর দিয়েছে জাতীয় বেতন কমিশন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় রেখে কমিশন নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত সুপারিশ ও প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশনপ্রধান সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিশন প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সব পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। জানা যায়, কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন কাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত হবে ১:৮। পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রস্তাবিত পে-স্কেলে বেতন বৃদ্ধির হারে চমক থাকলেও তা বাস্তবসম্মতও।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকার আর্থিক খাত সংস্কার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আয়-বৈষম্য কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত জুলাই মাসে পে-কমিশন গঠন করা হয় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্যে। কমিশন নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগেই তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে পেশ করেছে।
জানা যায়, নতুন বেতনকাঠামোয় (পে-স্কেল) সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ১০৫ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে আগের মতো ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন অর্থাৎ ২০তম ধাপে বা গ্রেডে বেতন ২০ হাজার টাকা আর সর্বোচ্চ প্রথম ধাপে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা নির্ধারিত আছে।
প্রস্তাবিত পে-স্কেলে পেনশন ও বৈশাখী ভাতা বাড়ানো, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বাস্থ্য বীমার প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরসমূহে ভাতাসমূহ পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ করছে কমিশন। এটি পুরো মাত্রায় কার্যকর হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে। পে- কমিশন বলেছে, প্রস্তাবিত পে-স্কেল পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করতে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এখন সরকারি চাকরিজীবীরা ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ হারে বিশেষ ভাতা পান। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এ সুবিধা সমন্বয় করা হবে।
জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টা প্রতিবেদন গ্রহণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। এ সময় তিনি বলেন, ‘এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এরজন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।’ এ সময় পে-কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান বলেন, ‘গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতন কাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণপূর্বক বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করেছে।’
প্রতিবেদন দাখিলকালে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘এই প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন পরবর্তী কাজ। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে, যে কমিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।’
গত বছরের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক অর্থ সচিব বর্তমানে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর নতুন কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ছিল আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি।
কর্মচারীদের কত বেতন বাড়ছে : বর্তমান বেতন কাঠামোতে চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারি অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। ফলে সর্বসাকুল্যে এই গ্রেডের একজন কর্মচারীর বর্তমানে বেতন আসে ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা। নতুন পে-স্কেলে তার মূল বেতন বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীরা মূল বেতনের সঙ্গে বাড়ি ভাড়া পান ৬৫ শতাংশ। এ ছাড়া চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা ও শিক্ষাভাতা পান। এসব সুবিধা মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে নতুন পে-স্কেলে চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী বেতন পাবেন ৪১ হাজার ৯০৮ টাকা।
মূলত ১৮, ১৯ ও ২০ গ্রেডে যারা বেতন পান তাদের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ধরা হয়। আর ১১ থেকে ১৭তম গ্রেডে বেতন পান তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা দশম গ্রেডে বেতন পান। অন্যদিকে নবম থেকে গ্রেড-১ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে ধরা হয়।
সচিবদের বেতন বাড়ছে কত : বর্তমান বেতন কাঠামোতে গ্রেড-১ অনুযায়ী, একজন সচিবের তার মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রেডে ১০৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। মূল বেতনের সঙ্গে একজন সচিব বাড়ি ভাড়া ৫০ শতাংশ, শিক্ষা ভাতা, মোবাইল ভাতা, ইন্টারনেট ভাতা, নিরাপত্তা ভাতা, বাবুর্চি ভাতা (কুক অ্যালাউন্স) ও গাড়ি সংরক্ষণের জন্য আলাদা টাকা পান। এসব সুবিধা মিলে নতুন পে-স্কেলে গ্রেড-১ পদমর্যদার একজন সচিবের সর্বসাকুল্যে বেতন হবে প্রায় ৩ লাখ টাকা। বর্তমানে জনপ্রশাসনে সচিব পদে কর্মরত রয়েছেন ৯০ জন কর্মকর্তা। এর বাইরে গ্রেড-১ অনুযায়ী বেতন পান কিন্তু সচিব ননÑ এমন কর্মকর্তা রয়েছেন ৩০ জন।
বৈশাখী ও পেনশন বাড়ানোর সুপারিশ : প্রস্তাবিত পে-স্কেলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতদিন ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীদের জন্য যাতায়াতের ভাতা ছিল। এ যাতায়াতের ভাতা নতুন বেতন কমিশন ১০ম ধাপ থেকে ২০তম পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করেছে। পেনশনভোগীদের পেনশনের হারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে কমিশন। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পান, এমন পেনশনভোগীদের পেনশন বাড়ছে ১০০ শতাংশের মতো। আর যারা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশন পান, তাদের ভাতা বাড়ছে ৭৫ শতাংশ। যারা মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান, তাদের বাড়ছে ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনধারীদের চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রথম থেকে দশম ধাপ পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া তুলনামূলক কম হারে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ১১তম থেকে ২০তম ধাপে বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি থাকবে। কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে, বেতন কমিশন মাসিক দুই হাজার টাকা ভাতা প্রদানের সুপারিশ করেছে। তবে শর্ত থাকে যে, সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ দুজন সন্তান এই সুবিধা পাবে। এতে আরও বলা হয়েছে, টিফিন ভাতার বর্তমানে প্রচলিত বিধানাবলি অব্যাহত থাকবে, তবে কমিশন ভাতার হার বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমানে প্রচলিত মাসিক টিফিন ভাতা ২০০ টাকার স্থলে ১,০০০ (এক হাজার) টাকা করা যেতে পারে।