× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও অপতথ্যের ছড়াছড়ি

কবির হোসেন

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩১ এএম

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪০ এএম

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব আর অপতথ্যের  ছড়াছড়ি সবাইকে আশঙ্কিত করে তুলেছে। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব আর অপতথ্যের ছড়াছড়ি সবাইকে আশঙ্কিত করে তুলেছে। ছবি: সংগৃহীত

গুজব আর অপতথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগেও ছিল, কিন্তু সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে এসবের ছড়াছড়ি সবাইকে আশঙ্কিত করে তুলেছে। বিশেষ করে বহুল ব্যবহৃত ফেসবুক ও ইউটিউবে নানা গুজব ও অপতথ্য পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে, যাতে স্পর্শকাতর চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্তিকর, উত্তেজনাকর ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে ফায়দা লোটা যায়। গুজবের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না সরকার পক্ষের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি থেকে সাধারণ মানুষ সবাই।

গুজব নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে রয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। টার্গেট করে এসব প্রার্থী নিয়ে ছড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন অপতথ্য, গুজব ও ডিপফেক স্ক্যান্ডাল ভিডিও। ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিও ক্লিপস তাদের যেমন অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে তেমনি সাধারণ মানুষদের মধ্যেও এসব নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে অনলাইনে গুজব, অপপ্রচার ও ভুয়া প্রচারণা মোকাবিলায় সারা দেশে সমন্বিত ও জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে একটি মিসইনফরমেশন প্রতিরোধ সেলও চালু করা হয়েছে। ওই সেলের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল, বিটিআরসি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন প্লাটফর্ম একযোগে কাজ করছে। নির্বাচন সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়ানো গুজব ঠেকাতে কাজ করছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সাইবার মনিটরিং টিম। দেশজুড়ে র‍্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন এলাকাতে বিষয়গুলো মনিটরিং করছে সাইবার মনিটরিং সেল।

ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সব মিলিয়ে এক বছরে রাজনীতির বিষয়ে ২ হাজার ২৮১টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যা অন্যসব ক্যাটাগরি থেকে বেশি। এই তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, রাজনৈতিক ইস্যুই ছিল গত বছর ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রধান ক্ষেত্র। ক্যাটাগরি হিসেবে একক মাসে ভুল তথ্য বেশি শনাক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই (ডিসেম্বরে ৪৪৬টি)। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত বছর এআই-ডিপফেকের ব্যবহার বেড়েছে ৪০৯ শতাংশ। আর নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে অপতথ্যের প্রবাহ। গত বছরের অক্টোবর থেকে রাজনৈতিক অপতথ্য জ্যামিতিক হারে বাড়তে দেখা গেছে। 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দৈনিক আমার দেশ’-এর নামে নির্মিত একটি ফটোকার্ডের মাধ্যমে কুমিল্লা-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়ন সম্পর্কিত খবর অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করার খবরের পাশাপাশি এই ফটোকার্ডটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি একসময় জাতীয় পার্টির সাবেক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, দৈনিক আমার দেশের ফেসবুক পেজ থেকে এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়নি। সংবাদপত্রটির কর্তৃপক্ষও নিশ্চিত করেছে যে এই কার্ডটি তাদের নয়। গত ১৫ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মূলধারার দৈনিক কালবেলার ডিজাইনসংবলিত একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়; যেটিতে লেখা ছিল, ‘সুখবর সুখবর সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে ফিরছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা, রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের আভাস পেলাম।’ কিন্তু রিউমার স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এরকম শিরোনামসংবলিত কোনো ফটোকার্ড কালবেলা প্রকাশ করেনিÑ প্রকৃতপক্ষে কালবেলার ফটোকার্ড ডিজাইনের আদলে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় ওই ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে। এসবের আগে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির ওপর ন্যক্কারজনক হামলা নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীকে উদ্ধৃত করে একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করেছে ডিএমপি। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের হীন ও গর্হিত কাজের সঙ্গে জড়িতদের শিগগির আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

শুধু এসব ঘটনাই নয়, নির্বাচন কেন্দ্র করে সাইবার মাধ্যমে প্রতিদিনই ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপতথ্য, গুজব ও ডিপফেক স্ক্যান্ডাল ভিডিও। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন ঘিরে অপতথ্য ও সাইবার মাধ্যমে ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সেই সঙ্গে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন গ্রহণের প্রক্রিয়া। কেননা সমাজমাধ্যমগুলো বিশেষ করে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটক, ইমো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা চুক্তি না থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারছে না বাংলাদেশের সাইবার পুলিশ। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, গুজবকারীদের টার্গেটে পরিণত হতে পারেন নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ব্যাকডোর প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর হাসান জোহা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ফেসবুক ও ইউটিউব। এসব প্লাটফর্মের সঙ্গে আইনি সহায়তার জন্য চুক্তি করতে হবে। এটা করলে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ অপপ্রচারকারীর তথ্য সরবরাহ করবে সরকারের কাছে। সেই উদ্যোগটা কোনো কারণে নেওয়া হয়নি। এটি হয়ে গেলে এসব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করি।’ তিনি জানান, ‘সচেতনতা দিয়ে সব সময় কিছু হয় না। এদের শনাক্ত করার ও শাস্তি দেওয়ার দুই-চারটা উদাহরণ স্থাপিত হলেই দেখা যাবে, জনগণ মামলা বা জেলহাজতে যাওয়ার ভয়ে এ কাজগুলো করার আর সাহস পাবে না। আর এ কাজটি করবে বিটিআরসির সঙ্গে।’ তাহলে সেই ব্যবস্থা সরকার কেনও নিতে পারছে না, কোথায় তা আটকে আছেÑ জানতে চাইলে এই সাইবার বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘অনেকগুলো শর্ত ফেসবুক দিয়েছে, গভর্ন্যান্স পলিসি দিয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।’ 

এদিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির সাইবার সেন্টার বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব-অপতথ্য ঠেকাতে কাজ করছে সংস্থাটির সদস্যরা। নির্বাচন ঘিরে নেওয়া হয়েছে বাড়তি মনিটরিং ব্যবস্থা। এ বিষয়ে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) বিশেষ পুলিশ সুপার মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন কেন্দ্র করে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করতে সিআইডির সাইবার সেলে বাড়ানো হয়েছে সদস্য সংখ্যা। তারা ২৪ ঘণ্টাই মনিটরিং করছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ ডিএমপির সিটিটিসির সাইবার ইউনিট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার আসনগুলোতে সাইবার মাধ্যমে গুজবের শিকার হতে পারেনÑ এমন প্রার্থীদের তালিকা করা হচ্ছে। দেশের বাইরে থেকেও অনেকে সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেন। বিভিন্ন নামে-বেনামে খোলা গ্রুপ ও পেজ থেকেও গুজব ছড়ানো হয়। এ ধরনের শতাধিক পেজ ও গ্রুপে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ডিবির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো আটকে রাখার সুযোগ নেই। চাইলেই কোনো কনটেন্ট ব্লক করা যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নানা নিয়মনীতি রয়েছে। আমরা কোনো কনটেন্ট ব্লক করতে বললেও সেটি তাদের রুলসের বাইরে থাকলে তারা কিন্তু ব্লক করবে না। তবে নির্বাচন ঘিরে সাইবার মাধ্যমে যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে আমরা তৎপর রয়েছি। ২৪ ঘণ্টাই সাইবার প্যাট্রলিং অব্যাহত রয়েছে।’ কেউ সাইবার মাধ্যমে হয়রানির শিকার হলে সাইবার পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবিলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের সহায়তা চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এ বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্কের সঙ্গে গত মঙ্গলবার টেলিফোনে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। আলোচনায় মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে ভুয়া তথ্যের এক ধরনের বন্যা দেখা যাচ্ছে। বিদেশি গণমাধ্যমের পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে এ তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ, গুজব ও অনুমানের ছড়াছড়ি চলছে বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়টি নির্বাচন-প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সরকার উদ্বিগ্ন।’

এ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অনলাইনে গুজব, অপপ্রচার ও ফলস প্রোপাগান্ডা মোকাবিলায় সারা দেশে সমন্বিত ও জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি মিস ইনফরমেশন প্রতিরোধ সেল ইতোমধ্যে চালু হয়েছে। ওই সেলের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল, বিটিআরসি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্লাটফর্ম একযোগে কাজ করছে।’ তিনি বলেন, ‘অপপ্রচার শনাক্ত ও প্রতিরোধে ফ্রন্টলাইনার ও ব্যাক অফিস টিম নিয়ে একটি বিশেষ কাঠামো গঠন করা হয়েছে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা