লাইটার জাহাজ সংকট
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:০১ পিএম
বহির্নোঙরে অবস্থান করা এমভি ওয়ান ব্রাইট মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে গম নিয়ে কাঁচপুর যাওয়ার জন্য গত ৩ ডিসেম্বর লাইটার জাহাজ এটিটি-২ কে বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)। বরাদ্দ দেওয়ার পর মাদার ভেসেল থেকে ১ হাজার ৭০০ টন গম বোঝাই করে ওইদিনই কাঁচপুরের উদ্দেশে রওনা দেয় জাহাজটি। এরপর মাস পেরোলেও ওই জাহাজটি কাঁচপুরে পণ্য খালাস করে ফিরে আসেনি।
শুধু এটিটি-২ লাইটার জাহাজটি নয়, এ রকম ৬৮৭টি জাহাজ বহির্নোঙর থেকে পণ্য বোঝাই করে বিভিন্ন ঘাটে যাওয়ার পর খালাস শেষ করে আর ফেরেনি। নির্ধারিত সময়ে ফিরে না আসায় অভিযোগ উঠেছে লাইটার জাহাজগুলোকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন আমদানিকারকরা। এতে লাইটার জাহাজ সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে।
বিডব্লিউটিসিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাইটার জাহাজ সংকটে এখন সার এবং কারখানার কাঁচামাল নিয়ে আসা পণ্য খালাসের জন্য লাইটার বরাদ্দ দিতে পারছেন না তারা। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বাড়ছে জাহাজজট।
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য নিয়ে আসা মাদার ভেসেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ে বন্দরের কুতুবদিয়া বহির্নোঙরে যেখানে ৪৫ থেকে সর্বোচ্চ ৫০টি মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের জন্য অপেক্ষায় থাকত, যেখানে ১৪ জানুয়ারি অপেক্ষায় আছে ৬৭টি। এর মধ্যে শুধু গম নিয়েই অপেক্ষায় আছে ১০টি মাদার ভেসেল। এসব জাহাজে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৭ টন গম রয়েছে। ১ লাখ ২৪ হাজার ৫০০ টন চিনি নিয়ে ভাসছে দুটি জাহাজ। এছাড়া সয়াবিন তেল, ভুট্টা, চুনা পাথর, ক্লিংকার, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে ভাসছে বাকি ৫৬ জাহাজ।
ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগংয়ের (আইভোয়াক)-সহ সভাপতি পারভেজ আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিডব্লিউটিসিসির অধীনে ১ হাজার ২০০-এর মতো লাইটার জাহাজ ছিল। এর মধ্যে ৩০০র কাছাকাছি লাইটার জাহাজ মোংলা বন্দরে চলে যায়। সেই হিসাবে এখন ৮৫০ থেকে ৯০০ জাহাজ বিডব্লিউটিসির সিরিয়াল মেনে চলাচল করে। এর মধ্যে ৬৮৭টি জাহাজ বহির্নোঙর থেকে পণ্য বোঝাই করে যাওয়ার পর খালাস করে ফিরে না আসায় আমরা চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ বরাদ্দ দিতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে বহির্নোঙর থেকে পণ্য নিয়ে ঘাটে খালাস করতে একটি লাইটার জাহাজের ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৫ দিন সময় লাগে, সেখানে একেকটি লাইটার জাহাজ এখন এক থেকে দেড় মাস ধরে পণ্য খালাস না করে বসে আছে।’
বাংলাদেশে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের তথ্য অনুযায়ী, ১ ডিসেম্বর থেকে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৬৮৭টি লাইটার জাহাজ বহির্নোঙর থেকে পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন ঘাটে যাওয়ার পর এখনও ফিরে আসেনি। এসব জাহাজে গম, সার, ছোলাসহ বিভিন্ন ধরনের ৯ লাখ ৮৪ হাজার ৪৭৪ টন পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে পণ্যের এজেন্ট সমতা শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং এজেন্সিসের নামে বরাদ্দ দেওয়া জাহাজ আছে ৬৮টি। এসব জাহাজে পণ্য বোঝাই আছে ৯৬ হাজার ১০০ টন।
আমিন এন্টারপ্রাইজের নামে বরাদ্দ দেওয়া ৭টি জাহাজে আছে ৮ হাজার ২০০ টন, টিএসটি গ্লোবালের নামে বরাদ্দ দেওয়া ১১৭টি জাহাজে আছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫০ টন, টিএস শিপিংয়ের নামে ১০টি জাহাজে আছে ১৩ হাজার ৯০০ টন, শামস নেভিগেশনের নামে দেওয়া ১টি জাহাজে ১ হাজার ৬০০ টন, লিটমন্ডের নামে দেওয়া ৪টি জাহাজে আছে ৭ হাজার ৯০০ টন, সি ওয়ার্ল্ডের নামে ১টি জাহাজে আছে ৮৫০ টন, সি লিফট সার্ভিসের নামে ৩টি জাহাজে আছে ৪ হাজার ৬০০ টন, মেসার্স এমএসটি মেরিন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের নামে ১২৭টি জাহাজে আছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৯০ টন, মডার্ন লজিস্টিক্সের নামে ৭৯টি জাহাজে আছে ১ লাখ ৮ হাজার ৬৩৪ টন, বাল্ক শিপের নামে দেওয়া ৭টি জাহাজে আছে ৮ হাজার ৮০০ টন, বিছমিল্লাহ নেভিগেশনের নামে বরাদ্দ দেওয়া ১৬টি জাহাজে আছে ২৩ হাজার ৩৫০ টন, হামিদিয়া এন্টারপ্রাইজের নামে ৪১টি জাহাজে ৪৮ হাজার ৫৫০ টন, গ্রিন টেডার্সের নামে ৫০টি জাহাজে ৬৮ হাজার ৯০০ টন, কাদেরিয়া এন্টারপ্রাইজের নামে বরাদ্দ দেওয়া ৬৫টি জাহাজে আছে ৮২ হাজার ৭০০ টন, শাহ আমানতের নামে ৮টি জাহাজে ১৪ হাজার ৩৫০ টন, এএম লজিস্টিক্সের নামে দেওয়া ১৬টি জাহাজে ২৯ হাজার ১০০ টন, মাদার শিপিং করপোরেশনের নামে ১০টি জাহাজে আছে ১২ হাজার ৮০০ টন এবং মেসার্স এএনজে ট্রেডিংয়ের নামে বরাদ্দ দেওয়া ৫৭টি জাহাজে আছে ৯৭ হাজার ৬০০ টন পণ্য।
এই ৬৮৭টি জাহাজ পণ্য বোঝাই করে বসে থাকায় মাদার ভেসেল থেকে খালাসের জন্য চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না লাইটার জাহাজ। এতে বহির্নোঙরে বেড়ে যাচ্ছে পণ্য নিয়ে আসা মাদার ভেসেলের গড় অবস্থানের সময়। এতে একদিকে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত সময় বন্দরে অবস্থান করায় মাদার ভেসেলের পরিচালন ব্যয় বাবদ ক্ষতিপূরণ গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। এছাড়া ঠিক সময়ে কারখানায় চুনা পাথর, ক্লিংকারসহ কাঁচামাল সরবরাহে ধীরগতির কারণে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ নভেম্বর ৬০ হাজার ২৯৭ টন গম নিয়ে চট্টগ্রাম আসে প্যান টালিসমান। এরপর দুই মাস পার হলেও এখনও জাহাজটি বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। এরপর ১০ ডিসেম্বর ৬০ হাজার ২৩০ টন গম নিয়ে চট্টগ্রামে আসে সোসিরিয়া জাহাজ। ওই জাহাজটি আসার এক মাস পার হলেও এখনও পণ্য খালাস করে ফিরে যেতে পারেনি। এরপর ২৩ ডিসেম্বর ৫৮ হাজার ৪৯০ টন গম নিয়ে আসে লিভার্টাঙ্গো। সেটিও পণ্য খালাস করে ফিরে যেতে পারেনি। এরপর ৩০ ডিসেম্বর ৫১ হাজার ৩০৩ টন গম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে ইউনিয়ন ওডিশেই জাহাজ। ওই জাহাজটিও এখনও পণ্য খালাস করে ফিরে যায়নি। এরপর চলতি জানুয়ারি মাসে আরও ৬টি জাহাজ গম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। সর্বশেষ ১৩ জানুয়ারি গুড হার্ট নামে একটি জাহাজে করে আমদানি করা হয় ৬০ হাজার ৩৪৯ টন গম। লাইটার জাহাজ সংকটে এই জাহাজটি থেকেও পণ্য খালাস শুরু হয়নি।