হাসিনা রেজিমে একাদশ সংসদ নির্বাচন
নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১৩ পিএম
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাই ছিল না। সেটি ছিল পূর্বনির্ধারিত ফলাফল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক আয়োজন মাত্র। ওই নির্বাচনে ব্যালট বাক্সে ভোট পড়ার অনেক আগেই ভোটের ফল নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই ভাগ্য নির্ধারণের প্রথম, সবচেয়ে নীরব কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ধাপটি ছিল সুপরিকল্পিত একটি রাষ্ট্রীয় অপারেশন, যা পরে ‘মিথ্যা মামলার প্রকল্প’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। এই প্রকল্পের একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল ভোটের মাঠ শূন্য করা, বিরোধী রাজনীতিকে থানার খাতা ও আদালতের কাঠগড়ায় বন্দি করে নির্বাচনকে একতরফা করে তোলা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মুখোশে আইনকেই তখন রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছিল।
পর্যবেক্ষকদের অভিমত, ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচন কোনো নির্বাচন
ছিল না, এটি ছিল আইনের মুখোশে একটি রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র। আর ‘মিথ্যা মামলার প্রকল্প’
ছিল সেই ষড়যন্ত্রের প্রথম বুলেট, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বুকে সরাসরি আঘাত হেনেছিল।
এ-সংক্রান্ত তদন্ত ও অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের
নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। কারণ বিএনপি ও অধিকাংশ বিরোধী
দল সংসদ নির্বাচন বর্জন করার কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ২০১৪ সালের ভোট ব্যাপকভাবে সমালোচিত
হয়েছিল। তাই ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাবিশ্ব এবং দেশের জনগণের
মনোভাবের কারণে সরকার বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে চাপে পড়ে যায়। বিএনপি নির্বাচনে
অংশ নিলে ভোটের ফল অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, এমন আশঙ্কা ও বাস্তবতায় তারা তাই চক্রান্তের
পথ বেছে নেয়। কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে সরকার তখন ‘বিরোধী দলকে নির্বাচনে আনো,
কিন্তু মাঠে থাকতে দিও না’Ñ এমন লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ বেছে নেয়। আর এটি বাস্তবায়নের
কেন্দ্র হয়ে ওঠে পরিকল্পিত মিথ্যা মামলার প্রকল্প।
দুদকের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই প্রকল্পের প্রধান রূপকার
ছিলেন তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। ২০১৮ সালের
জানুয়ারি মাসে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন। ওই
বৈঠকেই তিনি প্রতিশ্রুতি দেন ‘এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে কোনো বিএনপিকর্মী বা বিরোধী
দলের লোক নির্বাচনের মাঠে থাকতে না পারে।’ তার এই বক্তব্য ছিল রাষ্ট্রীয় অপারেশনটির
সূচনাবাক্য।
আছাদুজ্জামান মিয়ার দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ দেখা যায় ২০১৮
সালের জানুয়ারির শেষ দিকে। রাজধানীতে গোপনে ডেকে আনা হয় দেশের সব পুলিশ ইউনিট প্রধানদের।
সংবেদনশীল ওই বৈঠকেই ভয়াবহ পরিণতিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ
হেডকোয়ার্টার্সের প্রভাবশালী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান আল-মামুন। ঢাকাসহ সারা দেশের
চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) ও চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে আগাম
যোগাযোগ করে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। বৈঠকে মাহফুজুর রহমান আল-মামুন
খোলাখুলি বলেন, আদালত ও আইনগত কোনো সমস্যাই দেখা দেবে না। প্রয়োজনে তিনি প্রধান বিচারপতির
দপ্তর ও আইন মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিষয়টি অবহিত রাখবেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ আইন সমিতির
একাধিকবার সাধারণ সম্পাদক থাকার সুবাদে দেশের প্রায় সব সিএমএম ও সিজিএম তার পরিচিত।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আদালত সংশ্লিষ্ট
পুলিশের প্রায় সব অবৈধ আদেশ বাস্তবায়নের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন মাহফুজুর রহমান আল-মামুন।
ওই বৈঠকে প্রধান বক্তা আছাদুজ্জামান মিয়া মাদক মামলাকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের
অস্ত্রে পরিণত করতে সরাসরি নির্দেশ দেন। গ্রেপ্তার হওয়া মাদক ব্যবসায়ী বা ক্যারিয়ারদের
মামলায় বিএনপি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নাম জুড়ে দেওয়ার আদেশও দেন তিনি। নির্দেশ
দেওয়া হয় মাদক মামলার এফআইআরে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে
অন্তর্ভুক্ত করার। এসব মামলায় যারা নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট হিসেবে
কাজ করেন বা এলাকায় সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় তাদের বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়। এই তথ্য সংগ্রহের
দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের, থানা পুলিশ, ডিবি এবং ওসি ডিবিকে। আদালতে
কোনো জটিলতা দেখা দিলে সরাসরি মাহফুজুর রহমান আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশও
দেওয়া হয়।
বৈঠকে কয়েকজন তৎকালীন ইউনিট প্রধান আপত্তি তুলে বলেন, ‘মাদক মামলা
সাধারণত রিকভারি নির্ভর, যাদের কখনও মাদক সংশ্লিষ্টতার ইতিহাস নেই, তাদের নাম কীভাবে
যুক্ত করা হবে?’ কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘এসব ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশ পেলে পুলিশের
বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।’ কিন্তু এই আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং আছাদুজ্জামান
মিয়া জানিয়ে দেন, ‘কিছুই হবে না।’ নির্দেশ আসে, এফআইআরের ভাষা এমনভাবে তৈরি করতে হবে,
যাতে সরাসরি মাদক উদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত না দেখালেও বোঝানো যায়, গ্রেপ্তার হওয়া মাদক
কারবারি ওই বিএনপি নেতার কাছ থেকে মাদক নিয়েছে অথবা তার কাছে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল। ভাষার
কারসাজিতে অপরাধ সৃষ্টি ছিল এই প্রকল্পের মূল কৌশল।
এভাবেই শুরু হয় ‘মিথ্যা মামলার প্রকল্প’। যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল
নির্বাচনের আগেই বিএনপি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের এলাকা ছাড়া করা, ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট
দিতে না দেওয়া এবং আইনি হয়রানিতে আটকে রেখে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাদ দেওয়া।
ফলাফল ছিল ভয়াবহ ও পূর্বপরিকল্পিত। শত শত বিএনপি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মী মিথ্যা মামলায়
আসামি হন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের আগেই বহু নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন, বাকিরা আত্মগোপনে
যেতে বাধ্য হন। বিএনপি সারা দেশের ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত এজেন্ট দিতে ব্যর্থ হয়। আইনশৃঙ্খলা
বাহিনী সরাসরি ভোটডাকাতির কাজে ব্যবহৃত হয়। মাদক আইন পরিণত হয় রাজনৈতিক নিপীড়নের নির্মম
হাতুড়িতে।
সূত্র জানায়, এই প্রকল্পই ছিল ভোটডাকাতির প্রথম ধাপ। ব্যালট ছিনতাইয়ের
আগেই বিরোধী কণ্ঠ নিশ্চিহ্নের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় ব্লুপ্রিন্ট। এর মাধ্যমে শুধু একাদশ
জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়, গোটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই পাঠানো হয় নির্বাসনে।
যদিও এই প্রকল্পের প্রধান পরিকল্পনাকারী আছাদুজ্জামান মিয়াকে কোনোরকম শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। বরং তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে করা হয়েছে পুরস্কৃত। পুরস্কার হিসেবে ২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গেজেটের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সেলের (National Security Affairs Cell) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়, যা কার্যকর হয় ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বা যোগদানের তারিখ থেকে। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি আরও বিস্তৃত পরিসরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন চালান বলেও অভিযোগ রয়েছে।