একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
তানভীর হাসান ও নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৪ এএম
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি নিছক দুই-তিন দিনের তাৎক্ষণিক ঘটনা ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি সুপরিকল্পিত অপারেশনের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন। নির্বাচনের প্রায় তিন মাস আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি গোপন বৈঠকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এই নির্বাচনের নীলনকশা চূড়ান্ত করা হয়। ওই বৈঠকে সেনাপ্রধান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, সব গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, স্বরাষ্ট্র সচিব, নির্বাচন কমিশনের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন বলে একটি সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে।
সূত্রমতে, ওই বৈঠকের আগে তৎকালীন
স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিআইজি (পলিটিক্যাল) মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে তৈরি একটি অভ্যন্তরীণ
প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, স্বাভাবিক, অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ
১৪টি আসন পেতে পারে। এই রিপোর্ট সেসময় সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভেতর ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি
করে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহের সমন্বয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সিদ্ধান্ত
নিয়ে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়।
সূত্র জানাচ্ছে, সেদিনের বৈঠকে
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যে করেই হোক আওয়ামী লীগকে ২৯০টি আসনে বিজয়ী দেখাতেই হবে। এই পুরো
‘অপারেশন’-এর দায়দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তৎকালীন আইজিপি মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তদন্তেও ভোট ডাকাতির এসব অভিযোগের সত্যতা
পাওয়া গেছে। যার ভিত্তিতে মামলার প্রস্তুতি চলছে। দুদক এ বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে
আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না দিলেও প্রতিদিনের বাংলাদেশ একাধিক সূত্র থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত
হয়েছে।
যেভাবে গড়ে উঠল ‘টিম জাবেদ’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা
বলেন, ‘এসবির গোয়েন্দা প্রতিবেদন আসার পর শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ
পর্যায়ের সকল স্তরের টনক নড়ে ওঠে। তখন নির্বাচন নয়, বরং শুরু হয় টিকে থাকার হিসাব-নিকাশ।
এরপর থেকেই পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ার্দারের তত্ত্বাবধানে একটি গোপন অ্যানালাইসিস
টিম কাজ শুরু করে। পুলিশ সদর দপ্তরের নতুন ভবনের দোতলায় বা বর্তমান গ্র্যান্ড হলে
(সাবেক কপোতাক্ষ) এই টিমের কার্যক্রম চলত। টিমের কাজ ছিলÑ কোন আসনের কোন কেন্দ্রে কত
ভোট আগের রাতে ব্যালট বাক্সে ঢোকাতে হবে, কোথায় কতটা ‘ম্যানেজমেন্ট’ দরকার তার পূর্ণাঙ্গ
ছক তৈরি করা।
সূত্রের ভাষ্য, নির্বাচনের তিন
মাস আগের ওই বৈঠকে জাবেদ পাটোয়ারী প্রধানমন্ত্রীকে জানান, পুলিশ সদর দপ্তরে তার ওই
টিম ইতোমধ্যেই প্রস্তুত এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের পুরো দায় তিনি নিজেই নেবেন। বৈঠকে
উপস্থিত ছিলেন এমন একজন জুনিয়র কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার সঙ্গে এক
ধরনের দরকষাকষির মাধ্যমে জাবেদ পাটোয়ারী পুরো অপারেশন নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। পুলিশের
অভ্যন্তরে ‘টিম জাবেদ’ নামে পরিচিত একটি নেটওয়ার্ক ছিলÑ এমন অভিযোগ অনেক দিনের। ওই
নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ওই টিমই জাবেদ পাটোয়ারীর সব স্পর্শকাতর
ও গোপন কাজ বাস্তবায়ন করত। আনুগত্যের বিনিময়ে ক্ষমতা, পদোন্নতি ও সুবিধা ভাগাভাগির
অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। টিমের সদস্য হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে, তারা হলেনÑ
এসবির ডিআইজি (পলিটিক্যাল) মাহবুব হোসেন, ডিএমপির সিটিটিসির দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত
পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মো. মনিরুল ইসলাম, এসবির অ্যাডিশনাল আইজি (পলিটিক্যাল) এজেডএম
নাফিউল ইসলাম, টিঅ্যান্ডআইএমের অ্যাডিশনাল ডিআইজি কাজী জিয়া উদ্দিন, এসবির বিশেষ পুলিশ
সুপার (গোপনীয়) মিজানুর রহমান, পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসির এআইজি এএফএম আনজুমান কালাম,
এআইজি (অ্যাডমিন) মিলন মাহমুদ, এআইজি (আরঅ্যান্ডসিপি-১) মোহাম্মাদ মাহফুজুর রহমান আল-মামুন,
আইজিপির স্টাফ অফিসার মো. মাসুদ আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুনসুর আলম কাদেরী ও কাজী
মো. সালাহউদ্দিন।
পর্যবেক্ষকদের অভিমত, ২০১৮ সালের
৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ওঠার পরও কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়নি, কোনো
দায়ও নির্ধারণ হয়নি। বরং ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারিও একই ধরনের প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত
হয়। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছে এ নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কিন্তু তারপরও কয়েকজন
শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান; যা রাষ্ট্রীয়
প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে তৎকালে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।
কন্ট্রোল রুমে কাজ করেছেন অন্তত
৫৪ কর্মকর্তা
সূত্র জানাচ্ছে, প্রলয় কুমার জোয়ার্দারের
উদ্যোগে এবং তৎকালীন ডিআইজি (অপারেশন্স) আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের
লক্ষ্যে পুলিশের সদর দপ্তরে কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়। ২০১৮
সালের সেপ্টেম্বর থেকেই এখানে অফিসিয়াল কাজ বন্ধ রেখে শুরু হয় নির্বাচনী গবেষণা। অত্যাধুনিক
কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, স্ক্যানার ও প্রজেক্টরে সাজানো ওই কক্ষে নির্দিষ্ট
অ্যানালাইসিস টিম ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন ডিআইজি
আনোয়ার হোসেন, এআইজি নাসিয়ান ওয়াজেদ, এসপি খোরশেদ আলম, এসপি মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান
ও মাহফুজুর রহমান আল-মামুন।
সূত্রের দাবি, ২০১৮ সালের আগস্ট
থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এএসপি থেকে ডিআইজি পদমর্যাদার অন্তত ৫৪ জন কর্মকর্তা এই কন্ট্রোল
রুমে বসে কাজ করেছেন। তাদের মধ্যে ডিআইজি আনোয়ার হোসেন, গোপালগঞ্জের সাবেক এসপি আয়েশা
সিদ্দিকা, এআইজি নাসিয়ান ওয়াজেদ, এসপি খোরশেদ আলম, এসপি মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান
ছিলেন অন্যতম।
ডেটা, অ্যালগরিদম ও ভেটিংয়ের
অভিযোগ
ডিজিটাল যুগে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের
অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল ডেটা। যে কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোট ডাকাতির জন্য নির্বাচন
কমিশন থেকে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল সংগ্রহ
করে বিশ্লেষণ করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরের ওই কন্ট্রোল রুমে। কোন কেন্দ্রে আগের রাতে কত
ব্যালট ভরতে হবে, সে হিসাবই ছিল এই অ্যালগরিদমের মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে প্রিসাইডিং
ও পোলিং অফিসারদের ব্যাপক ভেটিং করা হয়। থানা ও এসবির মাধ্যমে যাচাই করে বিএনপি বা
জামায়াত-সমর্থিত বা তাদের আত্মীয়-স্বজন রয়েছেনÑ এমন কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার নির্দেশনাও
দেওয়া হয়।
সূত্র অনুযায়ী, পুরো দেশকে চারটি
বড় অঞ্চলে ভাগ করে সে সময় দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। এর মধ্যে রাজশাহী ও রংপুর, ঢাকা-গাজীপুর
ও ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে প্রথমে ভাগ করা হয়। মেট্রোপলিটন ও
রেঞ্জ এলাকাকেও আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পুরো অপারেশনের একটি রিহার্সেলও কপোতাক্ষে
সম্পন্ন হয় বলে সূত্রে জানা গেছে। এই বিশ্লেষণ রিপোর্ট ডিআইজি আনোয়ার হোসেন, এআইজি
নাসিয়ান ওয়াজেদ, এসপি খোরশেদ আলম ও মাহফুজুর রহমান আল-মামুন তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর
কাছে জমা দেন। অভিযোগ রয়েছে, জাবেদ পাটোয়ারী সেই রিপোর্ট প্রেজেন্টেশন আকারে তৎকালীন
প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন। নির্বাচনের দুদিন আগে ২৮ ডিসেম্বর, জেলা এসপি,
রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ কমিশনারদের কাছে নির্দেশনামূলক তথ্য পাঠানো হয়।
ইসিসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ ছাড়াও ভোট ডাকাতির পুরো প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন সচিব হেলাল উদ্দীন আহমদ, আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হক (দুলাল) এবং পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান আল-মামুনের মধ্যে একাধিক গোপন বৈঠক হয়। এসব বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল, তিন সংস্থার সমন্বয়ে মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে গৃহীত চূড়ান্ত পরিকল্পনা সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের শক্তিশালী এই সমন্বয় ছাড়া এত বড় পরিসরে ভোট কারচুপি বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না।